প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুর জন্য যোগ্যতাভিত্তিক অভিক্ষাপদ

চৌধুরী আবদুল্লাহ্ আল মামুন

১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তৃতীয় পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় (১৯৮৫-১৯৯০) জাতীয় শিক্ষাক্রম ও টেক্সট বুক বোর্ড কর্তৃক সে সময়ে প্রচলিত প্রাথমিক শিক্ষাক্রম পরিমার্জন ও নবায়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। ১৯৯০সালে প্রাথমিক শিক্ষা আইন পাশ করা হয়। আইনে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৯৯২সালে সরকার ৬৮টি থানায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করেন। এ কার্যক্রমের আশানুরূপ সাফল্যে ১৯৯৩সালে সারা দেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয় এবং তা অব্যাহত থাকে। ১৯৯২সাল হতে ২০০৪সাল পর্যন্ত প্রতি স্কুল থেকে ৫ম শ্রেণির অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের কেবল ২০% বৃত্তি পরীক্ষায় অবর্তীর্ণ হতো। উল্লেখ্য প্রাথমিক শিক্ষারমান নির্ণয়ের সূচক হিসেবে বৃত্তি পরীক্ষায় পাশের হারকে গন্য করা হতো। সেজন্য বছরের শুরু থেকেই ৫ম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ ক্লাস / কোচিং এর ব্যবস্থা কর হতো। শিক্ষকগণ ৫ম শ্রেণির ৮০% শিক্ষার্থীর প্রতি অপেক্ষকাকৃত কম মনোযোগ দিতেন। পরবর্তীতে তা ৩০% (মডেল স্কুল এর ক্ষেত্রে ৫০% এবং পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ১০০%) এ উন্নীত করা হয়। ফলে শিক্ষকগণ ৫ম শ্রেণির ৩০% শিক্ষার্থীর প্রতি বেশি নজর দিতেন যাতে করে কেউ পরীক্ষায় অকৃতকার্য না হয়। সকল শিক্ষার্থীদের প্রতি সমান গুরুত্ব প্রদান কীভাবে সম্ভব সে ব্যাপরে নেপ (National accademy for primary education) বিশেষভাবে চিন্তা-ভাবনা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করে। নেপ পাইলটিং কার্যক্রম হিসেবে ডিপিইও ময়মনসিংহ এর মাধ্যমে ২০০৪ সালে ময়মনসিংহ জেলার সকল উপজেলায় অভিন্ন প্রশ্নপত্রে সমাপনী পরীক্ষা সম্পাদন করা হয়। ২০০৫ সালে ৬ বিভাগের ১ জেলায় নেপ কর্তৃক সরবারাহকৃত বিষয় ভিত্তিক নমুনা প্রশ্নের মাধ্যমে সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশব্যাপী নেপ কর্তৃক সরবরাহ নমুনা প্রশ্ন ব্যবহার করে সমাপনী পরীক্ষা নেয়া হয়। উল্লেখ্য এক্ষেত্রে প্রতি জেলার ডিপিইও নিয়ন্ত্রনকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনি প্রয়োজনে সরবরাহকৃত প্রশ্নের ২৫%পরিবর্তন ও স্থানীয় পর্যায়ে মুদ্রণ করে পরীক্ষা পরিচালনা করেন।

নেপ কর্তৃপক্ষ বিগত  সরকারের (২০০৮-২০১৪) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২য় সভায় দেশব্যাপী ৫ম শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীদের জন্য সমাপনী পরীক্ষার ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব রাখে। সংসদীয় কমিটির সভায় মাননীয় প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তিনি তাঁর উপজেলায় সমাপনী পরীক্ষার আয়োজন করেছিলেন।

সংসদীয় কমিটির ২য় সভায় ২০০৯ সালে দেশব্যাপী সমাপনী পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং তা এখনও অব্যাহত আছে। ইতমধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার পরিমানগত দিক অর্থাৎ ৬+ থেকে ১০+ সকল শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করার বিষয়টি অর্জিত হয়েছে। এর গুণগত দিক যেমন নিয়মিত হাজিরা নিশ্চিত করা, প্রতি বিষয় এবং প্রতিটি শ্রেণির জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করা এবং পাঁচ বছর মেয়াদি শিক্ষাচক্র কৃতিত্বের সাথে সমাপ্ত করানো এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি বিশেষ  করে প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন।

নেপ ইতোপূর্বে বৃত্তি পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন করতো এবং এখন সমাপনী পরীক্ষা প্রশ্নও প্রণয়ন করছে। এসকল প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে অধিকাংশ প্রশ্ন মুখস্ত নির্ভর । অর্থাৎ যে সকল শিক্ষার্থীর স্মরণ শক্তি বেশি তারাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে। তাছাড়া প্রশ্ন পত্রে শিক্ষার্থীদের অনুধাবন প্রয়োগ এবং উচ্চতর দক্ষতার প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ সীমিত। ১৯৮৮ সাল থেকে এদেশে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে যোগ্যতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালু করা হয় এবং ১৯৯১ সাল হতে যোগ্যতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন শুরু হয়। কিন্তু আমাদের অভীক্ষাপদ প্রণয়ন পদ্ধতি এখনও যোগ্যতাভিত্তিক নয়। নেপ সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে পর্যায়ক্রমে যোগ্যতাভিত্তিক অভীক্ষাপদ সংযোজনের জন্য ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মন্ত্রণালয়ে একটি power point presentation করে। সে প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় হতে পরিপত্র জারি করা হয়। পরিপত্র অনুযায়ী নেপ প্রতি বছর যোগ্যতাভিত্তিক অভীক্ষাপদ প্রণয়ন, পাইলটিং, মার্কি ও বিশ্লেষণপূর্বক আইটেম ব্যাংক তৈরি করবে এবং উক্ত আইটেম ব্যাংক হতে নির্ধারিত  পরিমাণ / সংখ্যক যোগ্যতাভিত্তিক অভীক্ষাপদ সংযোজন করবে।

এখানে উল্লেখ্য যে, PEDP III তে ৫ম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষার বিষয়টি DLI (Disbersment Link Indicator) ভুক্ত।

যোগ্যতার ধারণা

প্রাথমিক স্তরে ২০০২সনে পরিমার্জিত যোগ্যতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রম প্রবর্তন করা হয়েছে। পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে ৫০টি প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্রান্তিক যোগ্যতাসমূহ প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও জাতীয় আদর্শের ভিত্তিতে এবং শিশুর চাহিদা পারঙ্গমতা, বয়স, সামর্থ্য ও অভিরুচির ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হয়েছে।

যোগ্যতা

শিখন-শেখানোর মধ্য দিয়ে কোন জ্ঞান, দক্ষতা বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ব করার পর শিশু তার বাস্তব জীবনে প্রয়োজনের সময়ে তা কাজে লাগাতে পারলে সেই জ্ঞান, দক্ষতা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে তার একটি যোগ্যতা বলা হয়। উদাহরণ-বাংলা বিষয়ের শিখন শেখানো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুদ্ধভাবে ও স্পষ্ট স্বরে কথা বলতে পারা দক্ষতা আয়ত্ব করার পর শিশু যদি নিজ গৃহে এবং বন্ধুদের সাথে শুদ্ধ ভাষায় ও স্পষ্ট স্বরে কথা বলতে পারে, তবে সেটি তার যোগ্যতা  বলে বিবেচিত হবে।

প্রান্তিক যোগ্যতা

প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা শেষে শিশুরা যে পূর্ব নির্ধারিত যোগ্যতা গুলো অর্জন করবে বলে আশা করা যায় সেগুলি প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের প্রান্তিক যোগ্যতা। উদাহরণ-প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে পরিমার্জিত ২০০২ সনের যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমে সর্বমোট ৫০টি প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন- ১৯নং প্রান্তিক যোগ্যতা পরিবেশ পরিচিত সমাজ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রান্তিক যোগ্যতা জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং এ বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।[ad id=”28167″]

বিষয় ভিত্তিক প্রান্তিক যোগ্যতা

প্রতিটি বিষয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা শেষে ৫০টি প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জিত হয়। যে ৫০টি প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জনের জন্য প্রত্যেক বিষয়ে পৃথক যোগ্যতা নির্ধারিত হয়েছে। যা শিক্ষার্থী কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষে অর্জন করে। এসব যোগ্যতাকে বিষয়ভিত্তিক প্রান্তি যোগ্যতা বলে।

শ্রেণিভিত্তক অর্জন উপযোগী যোগ্যতা

বিভিন্ন শ্রেণিতে ধাপে ধাপে নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জিত হয়। এই প্রান্তিক যোগ্যতার শ্রেণিভিত্তিক বিভাজিত ক্রমকে শ্রেণিভিত্তিক অর্জন উপযোগী যোগ্যতা বলে।

শিখনফল

কোন একটি পাঠ শেষে শিক্ষার্থী কী জ্ঞান , দক্ষতা ও দৃষ্টি ভঙ্গি অর্জন করবে সে সম্পর্কে পূর্বনির্ধারিত সুস্পষ্ট  ও সুনির্দিষ্ট বাক্য হলো শিখনফল। আচরণের পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার্থী কোন একটি যোগ্যতা অর্জিত হবে। এই শিখন ফলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর আচরণিক পরিবর্তন ঘটায় বলে   একে আচরণিক উদ্দেশ্যও বলা হয়।

প্রাথমিক স্তরের প্রান্তিক যোগ্যতাগুলি নিন্মরূপ

১.  সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’য়ালার প্রতি অটল আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করা।
২.  সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে জানা এবং স্রষ্টাকে সকল কাজে স্মরণ করা ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
৩.  আল্লাহ রাসুল  হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর স্ব স্ব ধর্ম প্রবর্তকের জীবন চরিত্র জানা এবং তাদের শিক্ষা আদর্শ অনুসরণ করা।
৪.  স্ব স্ব ধর্ম গ্রন্থ সম্পর্কে জানা এবং স্ব স্ব ধর্মের অনুশাসনের মাধ্যমে নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলি অর্জন করা।
৫.  স্রষ্টার সকল সৃষ্টিকে ভালবাসা।
৬. জাতি, ধর্ম বর্ণ, নারী, পুরুষ নির্বিশেষ সকলে প্রতি সম্মান ও সহনশীলতা প্রদর্শন করা।
৭.  অন্যান্য দেশের মানুষ সম্পর্কে জানা এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা মমত্ববোধ সঞ্চার করা।
৮. মানুষের মৌলিক চাহিদা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা এবং সুন্দর জীবন গঠনে সচেতন হওয়া।
৯.  নিজের অধিকার ও অন্যের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হওয়া।
১০.অপরের মতামত প্রকাশের সুযোগদান করা এবং ব্যক্ত মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।
১১. সকলের প্রতি সহযোগিতাপূর্ণ এবং বন্ধুত্ব সুলভ আচরণ করা।
১২. কায়িক শ্রমযুক্ত কাজে আগ্রহী হওয়া ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
১৩. পরিবারে সদস্য হিসেবে নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য জানা এবং গৃহকর্মে অংশগ্রহণ করা।
১৪. সামাজিক ও বিদ্যালয়ের কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের ও অপরের অধিকার কর্তব্য দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন হওয়া।
১৫.  গণতান্ত্রিক রীতি সম্পর্কে সচেতন তওয়া এবং সুনাগরিক হিসেবে নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে সজাগ হওয়া।
১৬. স্বার্থত্যাগের মনোভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশ গঠনমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা।
১৭.  বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়া।
১৮. মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়া।
১৯. জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য,সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা  এবং এ বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
২০. পরিবেশ উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সক্রিয় হওয়া।
২১. বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব এবং বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতির প্রতি উদারতাবোধ এবং বিশ্ব শান্তির চেতনার প্রতি আগ্রহী হওয়া।
২২. ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবহার ও সংরক্ষণে যতœশীল হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করা।
২৩. দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং পরিবেশের উপর এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা লাভ করা।
২৪. বাংলা ভাষার গঠন প্রণালী বাক্য বিন্যাস ও নিয়ম শৃঙ্খলার বিষয়ে জ্ঞান লাভ ও প্রয়োগ করতে পারা।
২৫. বাংলা ছড়া, কবিতা, গল্প, বক্তৃতা ও কথোপকথন মনোযোগ সহকারে শুনে মুল ভাব বুঝতে পারা।
২৬.সহপাঠী ও অন্যদের সঙ্গে বোধগম্যভাবে শুদ্ধ এবং প্রমিত উচ্চারণে চলিত বাংলা বলতে পারা।
২৭. বাংলা ভাষায় ছাপা ও হাতের লেখা বিষয়বস্তু শুদ্ধভাবে পড়তে পারা এবং পঠিত বিষয়বস্তুর মর্ম অনুধাবন করা।
২৮.পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও মনোভাব বাংলা ভাষায় শুদ্ধ ও স্পষ্ট ভাবে লিখে প্রকাশ করতে পারা, সাধারণ চিঠি ও দরখাস্ত লিখতে পারা এবং বিভিন্ন ফরম পূরণ  করতে পারা।
২৯. সংখ্যার ধারণা লাভ করা এবং সংখ্যা ব্যবহার করতে পারা।
৩০.সংখ্যাবাচক ও ক্রমবাচক (তারিখসহ) কাজসমূহ শুনতে , বলতে , পড়তে ও লিখতে পারা।
৩১.গণিতের প্রাথমিক চার নিয়ম জানা ও ব্যবহার করতে পারা।
৩২.পরিবেশের বিভিন্ন বস্তুর জ্যামিতিক আকার আকৃতি চেনা ও ব্যবহার করতে পারা।
৩৩.দৈর্ঘ্য , ওজন, ক্ষেত্রফল, আয়তন, সময় এবং মুদ্রার একক জানা ও ব্যবহার করতে পারা।
৩৪. বাস্তবমুখী এবং তথ্য ভিত্তিকসহ সমস্যা সমাধানে গাণিতিক কৌশল প্রয়োগ করতে পারা।
৩৫. পরিবেশের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ, বিন্যাস ও প্রক্রিয়ার করণের মাধ্যমে তা ব্যবহার করতে পারা।
৩৬. ক্যালকুলেটর ও কম্পিউটার সম্পর্কে জানা এবং হিসাব নিকাশে ক্যালকুলেটর  ব্যবহার করতে পারা।
৩৭.  জনসংখা বিষয়ক সমস্যা সমাধানে গাণিতকি জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারা।
৩৮. ইংরেজি ভাষায় সহজ কথোপকতন, গল্প ছড়া শোনা, বোঝা এবং উপভোগ করা।
৩৯. পর্যবেক্ষণ, ধারণা ও মনোভাব ইংরেজিতে সজহ শুদ্ধ বাক্যে বলতে পারা।
৪০.  ইংরেজির ভাষায় ছাপা ও হাতের লেখা বিষয়বস্ত পড়তে ও বুঝতে পারা।
৪১.  ইংরেজিতে শুদ্ধভাবে অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি বিষয় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখতে পারা।
৪২.  দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা।
৪৩. বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বনে সমস্যা সমাধানে অভ্যাস গঠন করা।
৪৪.  বিজ্ঞান সম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা।
৪৫.  পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে পরিবেশকে জানা ও অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে বস্তু ও ঘটনাকে শ্রেণীকরণ করতে পারা।
৪৬. চারু ও কারুকলা চর্চার (নকশা অংকন, চিত্রাঙ্কন, মাটি, কাঠ, কাপড় ও কাগজের কাজ ) মাধ্যমে সৃষ্টির বৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং নিজের সৃষ্টিশীলতা বিকাশ ও সৌন্দর্য্য চেতনা , নান্দনিক বোধ ও বৃদ্ধির উৎকর্ষ সাধন করা।
৪৭.  সংগীত, নৃত্য এবং নাট্যের মাধ্যমে নিজের সৃজনশীলতা বিকাশ ও সৌন্দর্য চেতনা , নান্দনিক বোধ ও বুদ্ধির উৎকর্ষ সাধন করা।
৪৮. খেলাধুলা এবং শরীরচর্চায় আগ্রহী হওয়া।
৪৯. সুস্থ্য জীবন যাপনের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য বিধি জানা ও পালন করা।
৫০. সততা, ন্যায়বোধ,কর্তব্যবোধ, শৃঙ্খলাবোধ ও শিষ্টাচারসহ সকলের সঙ্গে মিলেমিশে বাস করার মানসিকতা অজর্ন এবং আচরণে উদ্বদ্ধ হওয়া।
প্রতিটি বিষয়ের জন্য নির্ধারিত প্রান্তিক যোগ্যতা রয়েছে। যেমন বাংলায় প্রান্তিকযোগ্যতা ১৬টি, ইংরেজিতে ২৯টি, গণিতে ৩৭টি পরিবেশ পরিচিতি সমাজ ও বিজ্ঞানে ২২টি, ইসলাম ধর্মে ৫টি , হিন্দু ধর্মে ১৬টি, বৌদ্ধ ধর্মে ১৭টি ও হিন্দু ধর্মে ১৭টি, শারীরিক শিক্ষায় ৮টি, চারু ও কারু কলায় ১৫ট, সংগীতে ৯টি।

যোগ্যতার ধারণা

পরিমার্জিত প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারিত  করা হয়েছে। এই প্রান্তিক যোগ্যতাসমূহ প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য  , উদ্দেশ্য  ও জাতীয় আদর্শের ভিত্তিতে এবং শিশুর তাদের দেশাতœবোধে, বিজ্ঞান মনষ্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াসে নির্ধারণ করা হয়েছে।
যোগ্যতা: শিখন শেখানোর মধ্য দিয়ে কোন জ্ঞান, দক্ষতা বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ব করার পর শিশু তার বাস্তব জীবনে প্রয়োজনের সময়ে তা কাজে লাগাতে পারেল সেই জ্ঞান, দক্ষতা বা দৃষ্টি ভঙ্গিকে তার একটি যোগ্যতা বলা হয়। উদাহরণ-বাংলা বিষয়ের শিখন শেখানো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুদ্ধভাবে ও স্পষ্ট স্বরে কথা বলতে পারার দক্ষতা আয়ত্ব করার পর শিশু  যদি নিজ গৃহে এবং বন্ধুদের সাথে শুদ্ধ ভাষায় ও স্পষ্ট স্বরে কথা বলতে পারে অর্থাৎ জীবনের সর্বক্ষেত্রে যদি তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারে তবে সেটি তার যোগ্যতা বলে বিবেচিত হবে।

প্রান্তিক যোগ্যতা-প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা শেষে যে নির্ধারিত যোগ্যতা গুলো অর্জন করবে বলে আশা করা হয় সেগুলো প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের প্রান্তিক যোগ্যতা। যেমন-পরিবেশ পরিচিতি সমাজ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রান্তিক যোগ্যতা-জাতীয় ইতিহাস , ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং এ বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

বিষয় ভিত্তিক প্রান্তিক যোগ্যতা- প্রতিটি বিষয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা শেষে ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জিত হবে। যা শিক্ষার্থী কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের মাধ্যমে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষে তা অর্জন করে। এসব যোগ্যতাকে বিষয় ভিত্তিক প্রান্তিক যোগ্যতা বলে।
শ্রেণি ভিত্তিক অর্জন উপযোগী যোগ্যতা- বিভিন্ন শ্রেণিতে ধাপে ধাপে নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জিত হয়। শ্রেণিভিত্তিক যোগ্যতার এই বিভাজিত ক্রমকে শ্রেণিভিত্তিক অর্জন উপযোগী যোগ্যতা বলে।

শিখন ফল- কোন একটি পাঠ শেষে শিক্ষার্থী কী জ্ঞান, দক্ষত ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবে সে সম্পর্কে পূর্ব নির্ধারিত সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট বাক্য হলো শিখন ফল। এই শিখনফল অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর কোন একটি যোগ্যতা অর্জিত  হবে। এই শিখনফলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর আচরণের পরিবর্তন ঘটায়  বলে একে আচরণিক উদ্দেশ্যও বলা হয় ।

প্রাথমিক শিক্ষার পরিমার্জিত যোগ্যতাসমূহ

১. সর্ব শক্তিমান আল্লাহতা’য়ালা /সৃষ্টিকর্তার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন সকল সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসায় উদ্দীপ্ত হওয়া।
২. নিজ নিজ ধর্ম  প্রবর্তকের আদর্শ এবং ধর্মীয় অনুশাসন অনুশীলনের মাধ্যমে নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলি অর্জন করা।
৩. সকল ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
৪.  কল্পনা, কৌতুহল, সৃজনশীলতা ও বুদ্ধির বিকাশে আগ্রহী হওয়া।
৫. সংগীত , চারু ও কারুকলা ইত্যাদির মাধ্যমে সৃজনশীলতা, সৌন্দর্য চেতনা, সুকুমার বৃত্তি ও নান্দনিক বোধের প্রকাশ এবং সৃজনশীলতার আনন্দ ও সৌন্দর্য্য উপভোগে সামর্থ অজর্ন করা।
৬. প্রকৃতির নিয়মগুলো জানার মাধ্যমে বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জন করা।
৭.  বিজ্ঞানের নীতি ও পদ্ধতি এবং যৌক্তিক চিন্তার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের অভ্যাস গঠন বিজ্ঞান মনোস্কতা অর্জন করা।
৮. প্রযুক্তি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে জানা ও প্রয়োগের মাধ্যমে জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন করা।
৯.  বাংলা ভাষার মৌলিক দক্ষাত এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা।
১০. বিদেশি ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার মৌলিক দক্ষতা অর্জন ও ব্যবহার করা।
১১. গাণিতিক ধারণা ও দক্ষতা অর্জন করা।
১২. যৌক্তিক চিন্তার মাধ্যমে গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারা।
১৩. মানবাধিকার, আন্তর্জাতিকতাবোধ , বিশ্বভ্রাতৃত্ব¡ ও বিশ্বসংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী ও শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
১৪. স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তায় উৎসাহিত হওয়া এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুশীলন করা।
১৫. নৈতিক ও সামাজিক গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমে ভাল-মন্দের পার্থক্য নিরূপন এবং তা বাস্তব জীবেন প্রয়োগ করা।
১৬. ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠা ব্যবহার ও সংরক্ষণে যতœশীল হওয়া।
১৭.  বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুসহ নারী পুরুষ, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে সম্পৃতি ও শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের মানসিকতা অর্জন করা।
১৮. অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়ার মাধ্যমে ত্যাগের মনোভাব অর্জন  এবং পরমতসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করা।
১৯. সামাজিক কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশ গ্রহণ এবং নিজের দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
২০.  প্রতিকূলতা  ও দুযোর্গ সম্পর্কে জানা এবং তা মোকাবেলায় দক্ষ ও আত্ম প্রত্যয়ী হওয়া।
২১.  নিজের কাজ নিজে করা এবং শ্রমের মর্যাদা দেওয়া।
২২.  প্রকৃতি, পরিবেশ ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে জানা ও ভালোবাসা এবং পরিবেশের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ হওয়া।
২৩. আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনের সমস্যা মোকাবেলায় ইতবাচক ভূমিকা গ্রহণ।
২৪.  মনুষের মৌলিক চাহিদা ও পরিবেশের ওপর জনসংখ্যার প্রভাব এবং জনসম্পদের গুরুত্ব সম্পর্কে জানা।
২৫.  শরীর চর্চা ও খেলাধূলার মাধ্যমে শারীরিক  ও মানসিক বিকাশ সাধন এবং নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করা।
২৬. নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের অভ্যাস গঠন করা।
২৭.  মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত হওয়া এবং ত্যাগের মনোভাব গঠন ও দেশ গড়ার কাজে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করা।
২৮. জাতীয় ইতহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
২৯. বাংলাদেশকে জানা ও ভালোবাসা।

Concept of learning domain
মার্কিন মনোবিদ বেনজামিন ব্লুম শিখন ক্ষেত্রকে ৩ ভাগে বিভক্ত করেছেন। শিখনের ৩ ক্ষেত্র সমন্বয়ে পুরোপরি শিখন সংগঠিত হয়। শিখন ক্ষেত্র ৩টি হলো।

১. Cognitive Domain.
২. Affective Domain.
৩. Psychomotor Domain.

কোন টেক্সট দেখে পড়ে বা শুনে সংশ্লিষ্ট টেক্সট এর তথ্য উপস্থাপন করা, স্মরণ করা বা তথ্য বিশ্লেষণ করার  বিষয়টি জ্ঞানমূলক ক্ষেত্রের অন্তর্ভূক্ত । চিন্তন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট তথ্য  ব্যবহার করার বিষয়সমূহ শিখনে জ্ঞানমূলক ক্ষেত্রের অর্ন্তগত Cognitive Domain.
টেক্সট এ বণির্ত অথবা প্রতিফলিত ভাবাবেগ, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত জীবনমান উন্নত করা affective domain এর অর্ন্তভূক্ত।

টেক্সট এ বর্ণিত অথবা প্রতিফলিত ভাবাবেগ, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে অর্জিত দক্ষতার প্রয়োগ Psychomotor Dimain এর অর্ন্তভূক্ত।
Learning Domain এর তিনটি বিভাজনের মাধ্যমে Cognitive Domain এর অর্ন্তগত অজর্নসমূহ  (Achievement ) Paper pencil test এর মাধ্যমে মুল্যায়ন করা সম্ভব।

Affective Domain ও Psychomotor Domain এর অর্ন্তগত অর্জনমূহ  Performance paper pencil test এর মাধ্যমে  Assess করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট  Domain দুটির অর্ন্তগত অর্জন  Assess করার জন্য শিক্ষার্থীর আচরণিক পরিবর্তনের ধারাবাহিক দক্ষতা  প্রদর্শন পরিমাপ করতে হবে, যা  School Based Assessment প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্ভব।  

উপজেলা শিক্ষা অফিসার, রাউজান, চট্টগ্রাম

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ সংবাদ