২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

তারুণ্যের রঙে রঙিন বাংলা নববর্ষ

সবুজ মণ্ডল, বিশেষ প্রতিনিধিঃ

চৈত্রের খরতাপে পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া ছাইয়ের মতন যেন মুহূর্তেই উবে যায় গত একটি বছরের সব স্মৃতিকথা বৈশাখের এই দিনটাতে। চৈত্র সংক্রান্তির শেষলগ্নে জীবনের হালখাতায় কি পেয়েছি, কি হারিয়েছি, হারাতে হারাতে কি কি পেয়েছি কিংবা পাব বলে কি কিউ হারিয়েছি এসবের সমীকরণ যোগ আর বিয়োগে মিলাতে মিলাতে নিজের অজান্তেই যেন পুরিয়ে যায় শেষ পাতাটি। পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন এক উপন্যাসের নতুন এক ঘটনাপ্রবাহ যেখানে জরা-ব্যাধি-পীড়া-ক্লেশের সমাপন ঘটে নতুনের পুঁত-পবিত্র স্পর্শে। শোধন আর স্বপ্নের প্রত্যাশায় গ্রীষ্মের প্রথম সূর্যস্নান সঞ্জীবনী শক্তি সঞ্চার করে নতুন প্রাণে নব চেতনায় নব উদ্যোগে।

উপন্যাসের প্রতিটি পাতার মতোই একটা জীবনের প্রতিটি পরতে জড়িয়ে থাকা আখ্যান- উপাখ্যান, সময়-ক্ষণ -মুহূর্তরা আনন্দ-বেদনা আর কান্না-হাসির ধারায় ভাসিয়েছে আমাদেরকে। গত একটি বছরে আমরা যেমন প্রগতির শুচিবর্ষণে চেতনার গঙ্গাজলে ভিজে পরিশুদ্ধ হয়েছি, তেমনি হতাশার দাবদাহে পুড়েছে আমাদের জাতিসত্ত্বা। তারুণ্যের প্রলয় স্রোতে আর সাহসিকতায় জাতি আজ কলঙ্কমুক্ত, প্রতিষ্ঠা হয়েছে ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার। তেমনি আমাদেরই অসংলগ্নতা ও ভীরুতায় মানচিত্রের বুকে নতুন কলঙ্কের থাবাও পড়েছে। আশা- হতাশা আর অস্হিরতায় আমাদের জাতিসত্ত্বা খন্ডবিখন্ড হয়েছে। ভাঙা-গড়ার এই সময়স্রোতে আমরা জীবনকে টেনে নিয়ে এসেছি নতুন এক বছরের প্রারম্ভে। সেই রথে আমাদের নিত্যসঙ্গী ছিলো কীর্তি, উৎকর্ষ আর একরাশ অনাগত প্রত্যাশার অন্বেষণ। আর সেই মনোরথের সাওয়ার ছিল বরাবরি তরুণরা।

ছবি- মালিহা তাসনিম চেীধুরী মিশমা
ছবি- মালিহা তাসনিম চেীধুরী মিশমা

আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী মালিহা তাসনিম চেীধুরী মিশমার অপেক্ষার প্রহরের অবসান ঘটিয়ে পহেলা বৈশাখ যেন কড়া নাড়ছে দরজায়। পহেলা বৈশাখের দিনটাতে একটু সকালেই উঠতে হয় তার। এরপর মায়ের সাথে মিলে পছন্দমত বাঙ্গালি খাবার তৈরি করেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সকালটা মনের মতো করেই কাটিয়ে দেন। এরপর পছন্দের শাড়ি আর মাটির গহনা পড়ে বন্ধু -বান্ধবিদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। প্রতিবারের মতো এবারও চষে বেড়াবেন সি আর বি,শিল্পকলা আর চারুকলার চিরচেনা জায়গাগুলো। ছোটবেলায় পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে মিশমা বলেন, তখনকার পহেলা বৈশাখ খুব একটা দোলা দিতো না আমার মনে। কেননা তখন পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল মা-বাবা’র সাথে মেলায় গিয়ে মুখোশ,মুড়ি-মুড়কি,নকুল দানা এসব কেনা। এরপরই বাসায় এসে মায়ের হাতের রান্না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম আর পরদিন সকালে উঠে ভাবতাম, হায়!পহেলা বৈশাখ তো শেষ! আর এই ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে যেত আবার। কিন্তু বর্তমানে সময়ের সাথে উৎসবের পটও পরিবর্তন হয়েছে। এখন ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতাটুকু পরিবারও দিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন থাকেন পরিবারের সবাই। তাই আশা করব, প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।

ছবি- ইসতিয়াক হোসাইন তানসিন
ছবি- ইসতিয়াক হোসাইন তানসিন

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী ইসতিয়াক হোসাইন তানসিন পহেলা বৈশাখের এই দিনটিকে জীবনের অন্য আট দশটি সাধারণ দিনের মত মনে করেন না। তার কাছে এই দিনটি জীবনের সুন্দরতম রঙ্গিন দিনগুলোর একটি। কিভাবে কাটাবেন এইবারের পহেলা বৈশাখ এব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জানান, যদিওবা বৈশাখের আগমনী শুরু হয় চৈত্র সংক্রান্তির দিন থেকেই। তবে দিনটা উদযাপনের আয়োজন চলতে থাকে পুরো চৈত্র মাস জুড়েই। বৈশাখের পাঞ্জাবী পড়ে মায়ের হাতের পিঠা-পুলি-পায়েস দিয়ে শুরু হয় দিনের সকালটা। এর শাটলে চেপে বন্ধুদের সাথে যাওয়া প্রাণের ক্যাম্পাসে।সারাদিন হৈ-হুল্লোড় আর বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজিতে কখন যে সময় পার হয়ে যায় তার ইয়ত্তাই থাকে না! তরুণ এই আলোকচিত্র শিল্পী আরো বলেন,বছর তিনেক আগে শখের বশে হাতে ক্যামেরা তুলে নিলেও শখটাকে বাঁচিয়ে রাখতেই ফটোগ্রাফিকে পেশাদারিত্ব করে নিয়েছি।বৈশাখের এমন দিনটাতে কাঁধে ক্যামেরা থাকবে না এটা ভাবতেই স্বপ্নাতীত মনে হয় আমার কাছে। গান- আড্ডাবাজির ফাঁকে ছবি তোলার এহেন মোক্ষম সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করব তা কি হয়?

সকল অশুভ শক্তিকে নাশ করে মঙ্গললোকের মঙ্গলালোকে আলোকিত হয়ে উঠুক এই ধরা। তারুণ্যের অফুরান শক্তিতে শিকড় থেকে শেখড়ে পৌঁছুক আমাদের সমৃদ্ধি। ১৪২৩ বঙ্গাব্দের প্রতিটি দিন,প্রতিটি ক্ষণ সবার জন্য মঙ্গলবার্তা বয়ে আনুক। শুভ নববর্ষ।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ সংবাদ