কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু খুনের পর তার ভাইয়ের বন্ধু নিখোঁজ কলেজছাত্র মিজানুর রহমান সোহাগ বাড়ি ফিরেছেন।
কুমিল্লার সেনানিবাস এলাকার অদূরে নারায়ণসার গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে তুলে নেয়ার ১৬ দিন পর মঙ্গলবার ভোরে তাকে বাড়ির পাশে রেখে যায় অজ্ঞাতরা।
গত ২৮ মার্চ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে সাদা পোশাকধারী লোকজন তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
বন্দিদশা থেকে মুক্ত সোহাগ যা বললেন-
টানা ১৬ দিন শ্বাসরুদ্ধকর বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে মিজানুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘কখনও কখনও মনে হয়েছিল- আজ রাতেই আমাকে ওরা হত্যা করে ফেলবে; আজই মনে হয় আমার শেষ দিন।’
তিনি বলেন, ‘চোখ বাঁধা অবস্থায় দুঃসহ যন্ত্রণায় একেকটি দিন যেন মনে হয়েছিল একটি বছর। সময় যেন একদম ফুরাতে চাইত না। চোখে ভেসে আসতো বাবা-মাসহ আত্মীয়-স্বজনদের ছবি।’
বন্দিদশা থেকে বাবা -মায়ের বুকে ফিরে এসে মঙ্গলবার সকালে নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই ১৬ দিনের শ্বাসরুদ্ধকর বন্দিদশার বর্ণনা দেন সোহাগ। তবে তিনি অনেক কিছুই এড়িয়ে যান।
তনুর ছোট ভাই আনোয়ারের বন্ধু সোহাগ গত ২০ মার্চ তনু খুনের ঘটনার খবর টিভিতে দেখে আনোয়ারকে ফোন করেছিলেন। এরপর গত ২৭ মার্চ দিনগত গভীর রাতে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে একদল লোক বাড়ি থেকে সোহাগকে তুলে নিয়ে যায়।
সোহাগের বাবা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছেলে তনুর ভাইয়ের বন্ধু। তারা একসঙ্গে লেখা পড়া করেছে। আমরাও তনু হত্যার বিচার চাই।’
তিনি বলেন, ‘কিন্তু গত ২৭ মার্চ দিনগত গভীর রাত থেকে আমার ছেলে কোথায় ছিল তা আমরা এখনও জানি না। কেন তাকে এভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো তা জানতে র্যাব, পুলিশ, ডিবি ও সিআইডিসহ সকল সংস্থার কাছে গেলেও কেউই আমার ছেলের সন্ধান দেয়নি। আজ তাকে আমরা ফিরে পেয়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাচ্ছি।’
সোহাগের বড় বোন খালেদা আক্তার জানান, মঙ্গলবার ভোরে স্থানীয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বাড়ির অদূরে নাজিরা বাজার এলাকায় একটি সিএনজি স্টেশনের পাশে সোহাগকে গাড়ি থেকে রেখে যায় কিছু অজ্ঞাত লোক। তখন তার চাচা মো. তাজুল ইসলাম ও সেলিম তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।
তাজুল জানান, ‘প্রথমে সে আমাদের দেখে অস্বাভাবিক আচরণ করে। মনে হচ্ছিল- সে কাউকেই চিনতে পারছিল না।’
সোহাগ বলেন, ‘যখন আমাকে গাড়িতে তোলা হয়, তারপর থেকে সে কিছুই বলতে পারবে না। মনে হয়- তারা আমাকে অজ্ঞান করে ফেলেছে। এভাবে ৫/৬ দিন আমার জ্ঞান ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় সাড়ে ২৩ ঘণ্টাই চোখ বাঁধা থাকতো। শুধু খাওয়া ও বাথরুমে যাওয়ার জন্য কিছু সময়ের জন্য চোখ খুলে দেয়া হতো। একই কাপড়ে থেকেছি এতোদিন।’
কে বা কারা তাকে ধরে নিয়ে গেছে তাও সোহাগ জানেন না বলে জানিয়েছেন। তার সঙ্গে সেখানে আরও কয়েকজন লোককে আটক করে রাখা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সোহাগ বলেন, ‘তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে তারা আমাকে কিছুই বলেনি এবং কেউ খারাপ ব্যবহারও করেনি।’
সোহাগের মা সাহিদা বেগম জানান, ‘ছেলেকে ফিরে পেয়েছি- এটা আমাদের জন্য খুব আনন্দের। মায়ের বুকে ছেলে ফিরে এসেছে- এ আনন্দ কোনো ভাষা দিয়ে বুঝাতে পারবো না। এখন আর কারও বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ নেই।’
বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তর কুমার বড়ুয়া জানান, মিজান নিখোঁজের বিষয়ে তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়েছিল। তার বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজ-খবর নিয়েছি।
তিনি বলেন, ‘অন্য কোনো বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে পারবো না।’
উল্লেখ্য, গত ২০ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে ময়নামতি সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের পানির ট্যাংক সংলগ্ন স্থানে তনুর মৃতদেহ পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে- তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
নিহত তনু ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ইয়ার হোসেনের মেয়ে। টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ যোগাতেন তনু। তাদের গ্রামের বাড়ি মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুরে।
মেয়েকে হত্যার ঘটনায় গত সোমবার কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতদের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত তনুর বাবা ইয়ার হোসেন।
























