ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া ড. ইউনূসের সাক্ষাৎকার

রিসেট বাটন নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা, বক্তব্য স্পষ্ট করল সরকার

 

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার অর্থে রিসেট বাটন চাপার কথা বলেননি বলে দাবি করেছে তার প্রেস উইং।

বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) সকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহম্মদ ইউনূস রিসেট বাটন চাপার কথা বলেছিলেন, কলুষিত রাজনীতি থেকে নতুন যাত্রা বোঝাতে। যে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি বাংলাদেশের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে, মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করেছে, কোটি কোটি নাগরিকের নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। বাংলাদেশের গর্বিত ইতিহাসকে মুছে ফেলার অর্থে এ দুটি শব্দ ব্যবহার করেননি তিনি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আপনি যখন রিসেট বাটন চাপবেন তখন আপনার সফটওয়্যারটি পুনরায় সচল হবে। এটি হার্ডওয়্যার পরিবর্তন করে না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের হার্ডওয়্যার। সেটা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। কিছু মানুষ ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া ড. ইউনূসের সাক্ষাৎকারের ভুল ব্যাখ্যা করছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিতে গত ৮ আগস্ট ঢাকায় আসার পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থান ছিল আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। প্রথম স্বাধীনতা ১৯৭১ সালে দেশের গৌরবময় স্বাধীনতা যুদ্ধ।

বিবৃতিতে বলা হয়, অধ্যাপক ইউনূস মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই তিনি বাংলাদেশ নাগরিক কমিটি গঠন করেন এবং মার্কিন সরকারকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে রাজি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী প্রচারণা চালান। তিনি বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা সম্পর্কে বিশ্বকে অবহিত করার জন্য বাংলাদেশ নিউজলেটার প্রকাশ করেন।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ‘রিসেট বাটন’ নিয়ে কথা বলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। সেই বক্তব্যের জের ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে চলছে তুমুল আলোচনা।

এই শব্দ দু’টো এখন ফেসবুক সার্চের ক্ষেত্রে ‘পপুলার নাউ’ ক্যাটাগরিতে চলে এসেছে। শুধু তাই নয়, এই রিসেট বাটন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এতদূর গড়িয়েছে যে অনেকেই তাদের ফেসবুক পোস্টে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে লিখছেন ‘স্টেপ ডাউন ইউনূস’।

এমনকি, টুইটারে যে হ্যাশট্যাগগুলো এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ট্রেন্ড করছে, এটি তার মাঝে অন্যতম।

সামাজিক মাধ্যমে অধ্যাপক ইউনূসের নামে চলমান এই সমালোচনায় যেমন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থকদের বড় সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে, তেমনি সেই সরকারের বিরোধিতাকারীদেরও দেখা যাচ্ছে।

এদিকে, মাত্র দুই মাস আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ চেয়ে সামাজিক মাধ্যমে একটি জনপ্রিয় হ্যাশট্যাগ ছিল– স্টেপ ডাউন হাসিনা।

গত ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে চলে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপর প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রকাশ্য বা প্রচ্ছন্ন সমর্থন নিয়ে গত আটই অগাস্ট রাষ্ট্রপতির কাছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন মুহাম্মদ ইউনূস।

কিন্তু দুই মাসেরও কম সময়ের মাঝে কী এমন হলো যে মুহাম্মদ ইউনূস এত তোপের মুখে পড়লেন? কেন অনেকে প্রশ্ন করছেন যে ‘রিসেট বাটনে পুশ’ করলেই অতীত মুছে ফেলা যায় না?

রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ অবশ্য বলছেন, মানুষ ভুল বোঝাবুঝি থেকে অথবা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি সমর্থনের জায়গা থেকেই অধ্যাপক ইউনূসকে নিয়ে এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

‘রিসেট বাটন’ প্রসঙ্গ এল যেভাবে

সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯-তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে গিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। সেখানে বসেই গত ২৭শে সেপ্টেম্বর মার্কিন সংবাদমাধ্যম ভয়েস অব আমেরিকাকে একটি সাক্ষাৎকার দেন তিনি।

প্রায় ১৯ মিনিটের ওই সাক্ষাৎকারে তার কাছে অন্তর্তবর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ, সেনাবাহিনীকে ম্যাজেস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়াসহ আরও কিছু বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাওয়া হয়েছিলো।

তেমনই একটি প্রসঙ্গ ছিল— সরকার পতনের পর ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের যে বাড়িটি ছিল, যেটিকে পরবর্তী জাদুঘর বানানো হয়েছে, সেটিকে ‘বিনষ্ট’ করা হয়েছে; অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শোক দিবস হিসাবে ১৫ই অগাস্টের (শেখ মুজিবর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী) ছুটি বাতিল করা হয়েছে; শেখ মুজিবুর রহমানের বহু ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে।

উপস্থাপকের প্রশ্ন ছিল, ‘এ নিয়ে সমালোচনা আছে। অনেকেই বলছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তারা ফ্যাসিবাদের আইকন হিসাবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জাতির জনক হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান স্বীকৃত। এ ব্যাপারে আপনার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী?’

কিন্তু ড. ইউনূস উপস্থাপকের এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব দেননি। জবাব না দিয়ে তিনিই বরং উপস্থাপককে বললেন, ‘আপনি পুরোনো দিনের কথাবার্তা বলছেন। এর মাঝে একটা গণঅভ্যুত্থান হয়ে গেল। আপনার বোধহয় স্মরণে নেই। আপনি এমনভাবে কথা বলছেন, যেন এসব ঘটনা ঘটেইনি। নতুন ভঙ্গিতে যা হচ্ছে, সেটিকে দেখতে হবে তো।’

‘কত ছেলে প্রাণ দিলো, সেটা নিয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন নাই। কেন প্রাণ দিলো?’ তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন।

এর ঠিক পরেই তিনি বলেন, ‘প্রথম স্বীকার করতে হবে যে ছাত্ররা বলেছে, আমরা ‘রিসেট বাটন’ পুশ করেছি; এভ্রিথিং ইজ গন; অতীত নিশ্চিতভাবে চলে গেছে। এখন নতুন ভঙ্গিতে আমরা গড়ে তুলবো। দেশের মানুষও তা চায়। সেই নতুন ভঙ্গিতে গড়ে তোলার জন্য আমাদের সংস্কার করতে হবে।”

‘রিসেট বাটন’ প্রসঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত তার এই মন্তব্য ঘিরেই।

প্রধান উপদেষ্টার ওই মন্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা হচ্ছে।

অনেকেই বলছেন, চাইলেই অতীত মুছে দেওয়া যায় না। এমনকি, কেউ কেউ এও মনে করছেন, এই কথার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস প্রশ্নে মুহাম্মদ ইউনূস তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।

যদিও কারও কারও মতে, এখানে কেবলই একটি ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে এবং এটিকে কেন্দ্র করে একদল মানুষ রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইছেন।

ফেসবুকে এই মুহূর্তে ‘রিসেট বাটন’ প্রসঙ্গে যে সব পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে, সেগুলোর মাঝে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনের এক লাইনের একটি পোস্ট অন্যতম।

অনেকেই তার ওই পোস্ট নিজ নিজ প্রোফাইলে শেয়ার করেছেন। মিজ শাওন তার দেওয়া পোস্টে কটাক্ষ করে শুধু প্রশ্ন করেছেন, ‘রিসেট বাটনে চাপ দিলে নোবেল পুরষ্কারের কী হবে?’

এখানে উল্লেখ্য, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকসহ যৌথভাবে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তিনিই প্রথম বাংলাদেশি, যিনি এই পুরস্কার লাভ করেন।

অতীত মুছে ফেলা প্রসঙ্গে আবু সাঈদ নামক একজন ফেসবুক ব্যবহারকারীও মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত অর্জন ও পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

‘ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তানি শাসন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের জন্ম, শেখ হাসিনা সরকারের সকল অতীত কর্মকাণ্ড’ মুছে গেছে কি না, এই প্রশ্নও রাখেন তিনি।

যদিও তার ওই পোস্টে আদনান এইচ খান নামে একজন লিখেছেন, ‘এটি স্রেফ একটি উপমা।’

এমন আরও অনেকেই ফেসবুক ও টুইটারে লিখেছেন যে মুহাম্মদ ইউনূস ওই সাক্ষাৎকারে ১৯৭১ সাল তথা বাংলাদেশ গঠনের ইতিহাসকে অস্বীকার করে কথা বলেছেন।

রিসেট বাটনে চাপ দেওয়া প্রসঙ্গে কথা বলেছেন লেখক তসলিমা নাসরিনও। তবে তার প্রশ্নটা একটু ভিন্ন।

তিনি প্রশ্ন করেছেন, মুহাম্মদ ইউনূস যে তরুণদের কথা বলছেন, তাদের মাঝে কারা রিসেট বাটন টিপেছে? মুহাম্মদ ইউনূসকে বিভিন্ন ধর্ম ও মতবিদ্বেষী তরুণরা ঘিরে রেখেছে উল্লেখ করে তিনি আরও জানতে চেয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা ওই তরুণদেরকেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব দিতে চান কি না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘রিসেট বাটন’ লিখে সার্চ দিলে এরকম অনেক পোস্ট সামনে আসবে।

যারা পোস্টগুলো করছেন, তারা সবাই যে পরিচিত বা জনপ্রিয় মুখ, তেমন না। অনেক সাধারণ মানুষ বা যারা গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তারাও ‘রিসেট বাটন’ প্রসঙ্গে হতাশ।

এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জহিরুল ইসলাম (জেড আই) খান পান্নাও কথা বলেছেন।

তিনি বলেছেন, মুহাম্মদ ইউনূস জ্ঞানী হলেও মুক্তিযুদ্ধে তার কোনো অংশগ্রহণ আমরা জানি না।

‘রিসেট বাটন কিন্তু আমরাও চাপতে পারি। আমরা ১৯৭১ সালে রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে পাকিস্তানকে ওয়াশ-আউট করে বাংলাদেশ তৈরি করছি, সেভাবে আবারও রিসেট বাটন চাপ দিতে পারি।’

জেড আই খান পান্নার এই বক্তব্যও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে শেয়ার করছেন।

বিষয়টিকে আরও যেভাবে দেখা যায়

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইতিহাস লিখে পাঠকের কাছে বেশ পরিচিতি পেয়েছেন গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। এই লেখক ও গবেষক মনে করেন, ‘রিসেট বাটন’ নিয়ে যা হচ্ছে, তা ভুল বোঝাবুঝি।

‘আমি পলাশীর যুদ্ধের কথা ভুলে গেছি, পানিপথের যুদ্ধের কথা ভুলে গেছি। সিপাহী বিদ্রোহের কথা ভুলে গেছি। সাতচল্লিশও ভুলে গেছি। এখন যে জেনারেশন এই পরিবর্তন এনেছে, তাদের বয়স ২৫-৩০ বছরের নিচে। তারা একাত্তর দেখে নাই। ঠিক যেভাবে আমি পলাশী দেখি নাই।’

তিনি বলেন, কথা হলো, মানুষের নানান বিষয় নিয়ে আবেগ থাকতে পারে। কিন্তু এগুলো নিয়ে যারা সমালোচনা করছে, এখানে একটা রাজনীতি আছে। তারা সবাই পরাজিত শক্তির পক্ষে।

তার মতে, ‘রিসেট বাটন’ প্রসঙ্গে এই মুহূর্তে যারা সমালোচনা করছেন, ‘তারা মনে করে যে একাত্তর-ই শুরু, একাত্তর-ই শেষ। অথবা, পঁচাত্তরের পর সব শেষ হয়ে গেছে। ‘বঙ্গবন্ধু না থাকলে বাংলাদেশ হতো না’ দাবির পাশাপাশি সমালোচনাকারীরা এখন বলছেন যে ‘বাংলাদেশ একমাত্র নিরাপদ থাকে শেখ হাসিনার হাতে’- শেখ হাসিনা বিদায় হয়ে গেছে, এটা তাদের সহ্য হচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘রিসেট মানে হলো, আমাদের সবকিছু আমূল সংস্কার করতে হবে। প্রচলিত ধারার রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সরকার ব্যবস্থা, অর্থনীতি আমরা চাই না। এখান থেকে বের হতে হলে অতীত থেকে একটা ছেদ ঘটাতে হবে। উনি (মুহাম্মদ ইউনূস) যদি এটাই বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে আমি মনে করি, উনি ঠিকই বলেছেন।’

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ সংবাদ