মোহাম্মদ ইলিয়াছ
সরকার সম্প্রতি শিক্ষা আইন-২০১৬‘র খসড়া আইন প্রনয়ন করেছে। প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং বাণিজ্যে জড়িত এবং নোট-গাইড বই প্রকাশ ও পড়ানোর শাস্তির বিধান রেখে এ আইন প্রনয়ন করা হয়েছে। এ আইনের খসড়ার উপর মতামত চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আগামী ১০ এপ্রিল পর্যন্ত এ আইনের উপর মতামত দেয়া যাবে বলে বলা হয়েছে। আমি মনে করি, সরকারের এ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত যুগোপযোগি। কেননা সরকারের শিক্ষানীতি-২০১০ বাস্তবায়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দেশকে উন্নত দেশ পরিণতকরণের পথ সুগম হবে। সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়নের পথ ফলপ্রসূ হবে।
বর্তমানে দেশে প্রাইভেট টিউশন-কোচিং বাণিজ্যের মহোৎসব চলছে। সময়ে- অসময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে প্রতিনয়ত চলছে শিক্ষার এ অনৈতিক কর্মকান্ড। অন্যদিকে সমানতালে চলছে নোটবই-গাইডের রমরমা ব্যবসা। এ সব বেড়াজাল থেকে নিস্তার পাচ্ছে না শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা। ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সৃজনশীল শিক্ষা। বাধা গ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার উন্নয়ন। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশ ও ২০২১ সালের মধ্যে উন্নত আয়ের দেশ পরিণতকরণে শিক্ষা আইন-২০১৬ কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। উক্ত আইন কার্যকরী করতে উপর আমার কিছু মতামত নিন্মে উল্লেখ করা হল:
১) সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন: দেশে বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু হয়েছে। কিন্তু এ সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি গাইড নির্ভর। দেখা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার সৃজনশীল প্রশ্ন হয় গাইড থেকে। এমসিকিউ ও সিকিউ প্রশ্ন পত্রে নেই কাঠিন্যের প্রয়োগ। পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার সপ্তাহ খানেক আগে বা আরো কম সময়ে করা হয় প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে মতামত হচ্ছে- কোন শ্রেনীর বছরে যদি দু‘বার পরীক্ষা হয় তাহলে শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সম্মাণিত শিক্ষকরা প্রশ্ন তৈরির কাজে লিপ্ত থাকবেন। যদি একটি পরীক্ষা জুন মাসে হয় তাহলে জানুয়ারী থেকে প্রশ্ন তৈরির কাজে হাত দিতে হবে। প্রশ্ন হতে হবে সৃজনশীলতার নিয়ম-নীতির ভিত্তিতে। টেক্সবোর্ড অনুমোদিত পাঠ্য বইয়ের জ্ঞান ব্যবহার করে সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করতে হবে। এসব কথা শিক্ষা আইন-২০১৬ তে থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। তাহলে কোচিং- প্রাইভেট বাণিজ্য ও নোট-গাইড বই বন্ধ হয়ে যাবে।
২) মনিটরিং সেল গঠন: কোচিং বাণিজ্য ও নোট-গাইড বই বন্ধে উপজেলা বা এরিয়া ভিত্তিক মনিটরিং সেল গঠন করা উচিত। উপজেলার ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী অফিসার , মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে নিয়ে এবং জেলার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক ও জেলা শিক্ষা অফিসারকে নিয়ে এ কমিটি গঠন করতে হবে। উক্ত কমিটি কোচিং বাণিজ্য ও নোট- গাইড বই বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করবেন এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন। অন্যদিকে যে সমস্ত শিক্ষক ক্লাসের সময়ে প্রাইভেট- কোচিং বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। উপজেলার ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী অফিসার যদি তৎপর হন তাহলে কোন ব্যাপারই নয় কোচিং বাণিজ্য ও গাইড বই বন্ধ করা।
৩) সম্মাণিত শিক্ষকদের সহযোগিতা: বর্তমান সরকার সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদেরকে মর্যাদা সম্পন্ন বেতন দিচ্ছেন। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছেন। সম্মাণিত শিক্ষকদের উচিত সরকারকে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিতে সহযোগিতা করা। কোচিং বাণিজ্য ও গাইড বই বন্ধে সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা শিক্ষকদের উচিত।
৪) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ: কোচিং বাণিজ্য ও নোট-গাইড বই বন্ধের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ অত্যন্ত জরুরী। কেননা জাতীয়করণে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেলে তাঁরা কোচিং বাণিজ্যের দিকে কম মনোনিবেশ করবে। ক্লাসে পড়ালেখার প্রতি আন্তরিক হবে। সৃজনশীল শিক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে। জানা গেছে, দেশে এমপিওভূক্ত ও স্বীকৃতি প্রাপ্ত মাধ্যমিক স্কুল-কলেজ-কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-মাদ্রাসার সংখ্যা ৩৫ হাজার ৩৯৬টি। এসব শিক্ষ প্রতিষ্ঠানে পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষক রয়েছে। জাতীয়করণের জন্য ৪০ হাজার ১৯ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে সংশ্লিষ্টরা জানান। এক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেলে জাতীয়করণের ব্যয় আরো কম লাগতে পারে। শিক্ষায় বিনিয়োগ লাভজনক এতে কোন সন্দেহ নেই। শিক্ষায় বিনিয়োগ সর্বোৎকৃষ্ট বিনিয়োগ। উন্নত দেশে শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করা হয়। দেশকে উন্নত দেশে পরিণতকরণে শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ শিক্ষা জাতীয়করণ জরুরী। তাহলে শিক্ষা আইন-২০১৬ বাস্তবায়ন ফলপ্রসু হবে।
৫) বেতন ও অন্যান্য ফি বৃদ্ধি: শিক্ষা আইন-২০১৬ ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষার্থীদের বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। সাথে অন্যান্য ফি বাড়াতে হবে। কেননা শিক্ষায় বিনিয়োগে আন্তরিকতা বাড়ে।এতে লেখাপড়ার প্রতি আন্তরিকতা সৃষ্টি হবে শিক্ষার্থী-অভিভাবকের। অভিভাবকের দায়িত্বশীল আচরণ তৈরি হবে। অভিভাবকের দায়িত্বশীল আচরণে তার সন্তানের পড়ালেখার মান বাড়বে।
৬) পরিচালনা কমিটির তৎপরতা বৃদ্ধি: অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা সভাপতি হন তাদের অধিকাংশই এলাকার বাইরে থাকেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নজর রাখতে অসুবিধা হয়। এলাকায় থাকেন এমন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিকে সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। অন্যদিকে একইব্যক্তি একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই ব্যক্তি যদি চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তাহলে পরিচালনা কতটুকু ফলপ্রসু তা চিন্তার বিষয়। শিক্ষা আইন-২০১৬ ফলপ্রসু করতে হলে এলাকায় থাকেন এমন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।
৭) শিক্ষকের রেগুলার উপস্থিতি ভাতা প্রদান: যাঁরা নিয়মিত ক্লাসে আসবেন এবং কলেজে বেশিক্ষণ সময় দিবেন তাদের জন্য উপস্থিতি ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি চাকরিজীবিদের মত বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য সব ধরণের ভাতার ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আন্তরিকতা সৃষ্টি হবে শিক্ষকদের।
৮) অনুমোদনহীন বই পাঠ্য সূচিতে অর্ন্তভূক্ত না করা: শিক্ষা আইন-২০১৬ তে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক প্রনয়নকৃত বই ছাড়া অন্য কোন বই পাঠ্যসূচিতে অর্ন্তভূক্ত করতে পারবে না। এটি যথোপযুক্ত বলে আমি মনে করি। কেননা আজকে যদি আমরা প্রাইমারী থেকে কলেজ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে দেখা যায়, নোট বই ও গাইড আর গাইড‘র ব্যবহার। এতে সরকারের সৃজনশীল শিক্ষা বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে। এ ব্যাপারে কোন খবরা-খবর রাখে না উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নোট- গাইড বইয়ের ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে দেশ শিক্ষা উন্নয়নে এগিয়ে যাবে।
৯) বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ: শিক্ষা আইন-২০১৬ তে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার যে বেহাল দশা ও বিজ্ঞান শিক্ষা যে হারিয়ে যাচ্ছে এতে কারো কোন খেয়াল নেই। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিজ্ঞান শিক্ষা বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই কোন বিজ্ঞান শিক্ষক ও নেই কোন ল্যাব। জোড়াতালি দিয়ে চলছে গ্রমাঞ্চলের বিজ্ঞান শিক্ষা। বিজ্ঞার শিক্ষার এ দূরবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আইন প্রনয়ন করতে হবে। না হয় বিজ্ঞান শূন্য হয়ে যাবে দেশ।
১০) একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি বন্ধ করা: অনেক শিক্ষক একাধিক প্রতিষ্ঠনে ক্লাস নেয়। ক্লাস নেয়ারও কথা। এমপিওভূক্ত শিক্ষকের যে বেতন স্কেল তা নুন আনতে ফানটা পুরায়। তবে বর্তমানে যে বেতন স্কেল এমপিওভূক্ত শিক্ষকদেরকে সরকার দিচ্ছে তাতে সমস্যা থাকার কথা নয়। সচেতন ও দায়িত্ববান শিক্ষকরা এ অনৈতিক কাজ জড়িয়ে পড়তে পারে না। গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়, শিক্ষা পিরিয়ডের সময় কিছু কিছু শিক্ষক নিজের এমপিওভূক্ত প্রতিষ্ঠানে চকরির পাশপাশি কিন্ডার গার্টেন বা অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে কিংবা ক্লাস নেয়। এ অনিয়ম বন্ধ না করলে শিক্ষার প্রকৃত অবস্থান ব্যাহত হবে। এ জন্য সরকারের উচিত শিক্ষকদের জন্য বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার ব্যবস্থা করা।
পরিশেষে বলা প্রয়োজন, বেসরকারি শিক্ষকদেও আর্থিক সচ্ছলতায় হতে পারে শিক্ষার উন্নয়ন। তবে একথা অস্বীকার উপায় নেই লোভ আছে মানুষের। শিক্ষকরাও মানুষের বাইরে নয়। আর আইন দিয়েও সব কিছু হয় না। আইন করলেও হবে না। আইনের বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা থাকতে হবে। সচল করতে হবে সংশ্লিষ্ট সকলকে সৃজনশীল শিক্ষার উন্নয়ন সর্বোপরি দেশকে উন্নত দেশে পরিণতকরণে শিক্ষা আইন-২০১৬ অত্যন্ত জরুরী। আশা করি, সরকার দেশের সচেতন মহলের কাছ থেকে আইনটির ব্যাপারে মতামত সংগ্রহ করে উপযুক্ত মতামতটি স্থান দেবেন। যতদ্রুত সম্ভব আইনটি বাস্তবায়ন করে দেশের শিক্ষাকে উন্নত শিখরে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক আলহাজ্ব মোস্তফিজুর রহমান কলেজ, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম
























