২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সাহিত্য কি আবেগ থেকে আলাদা- আকাশ ইকবাল

সাহিত্য কি আবেগ থেকে আলাদা? এই প্রশ্নটি আমাকে বেশ কিছু দিন ধরে ভাবাচ্ছিল। কিন্তু কোন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কবিতা, গল্প ও উপন্যাস, এগুলো সাহিত্যেরই একটা অংশ। প্রশ্নটি আমাকে ভাবাচ্ছে তখন থেকে যখন আমি আবেগে পড়ে কয়েকটা কবিতা, একটা অনুগল্প ও একটা উপন্যাস লিখি। অনেক চিন্তা ভাবনা করার পর আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, সাহিত্য আর আবেগ পরস্পর সম্পর্কিত। আমি কয়েকজন কবি ও সাহিত্যিকের সাথে কথাও বলেছি এই বিষয়ে। তাদের বক্তব্য এই, ‘আবেগ ছাড়া সাহিত্য হয় না, আবেগের মধ্যে দিয়েই সাহিত্যেও প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়।’ তাঁদের দাবি, ‘আবেগ ছাড়া সাহিত্য চর্চা করে বস্তুবাদীরা। যার কারণে বর্তমানে কবি সাহিত্যিক লেখকদের এই অবস্থা। যার মধ্যে কোন রসকস বলতে কিছুই নেই।’ সত্যি কথা বলতে কি পৃথিবীর প্রত্যেক লেখক প্রথমে তার লেখালেখি শুরু করেন আবেগের মহে পড়ে। প্রশ্ন উঠতে পারে, আবেগ তো সবারই আছে। তাহলে সবাই কেন সাহিত্য চর্চা করে না? সেই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলব, ‘যে আবেগ জন্মে মানুষের সমাজ জীবনের তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে জীবনের চড়াই-উৎরাই নানা ধরণের অভিজ্ঞতা থেকে।’ ‘আর এই অভিজ্ঞতাকে যারা কিছু শব্দ, অনেকগুলো বাক্য দিয়ে বিন্যাস করে অন্যের উপরে প্রভাব ফেলতে পারার ক্ষমতা আছে তারাই সাহিত্যিক।’ অনেক কবি উপন্যাসিক আছেন যাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর মনের মধ্যে যে আবেগ জন্মে তা ধারাবাহিকভাবে লিখতে থাকে। যা এক সময় গল্প, কবিতা বা উপন্যাসে রূপ নেয়। সাহিত্য’ শব্দটি ‘সহিত’ থেকে উদ্ভুত। সাহিত্য বলতে সঙ্গ, সাহচর্য বা মিলনকে বুঝায়। মানুষের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক চিন্তার সম্মিলনে সাহিত্যের সৃষ্টি হয়।
সে জন্য কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ভাষায় লিখেছেন, “বস্তুত বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব চরিত্র মানুষের হৃদয়ের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে সংগীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষায় রচিত সেই চিত্রই এবং গানই সাহিত্য।”
আবেগ কি? কেন আবেগ সৃষ্টি হয়? কোথায় থেকে হয়?- চেতনার যে অংশ অনুভূতি কিংবা সংবেদনশীলতার সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত তাকে আবেগ বলে। আর যদি একটু বিশ্লেষণ করে বলি- আবেগকে অনেকে অনুভূতির সমার্থক ধরে নেয়। অর্থ্যাৎ আবেগ হলো অনুভূতির এক বিশেষ রূপ বা ধরণ। মনোচিকিৎসকরা আবেগকে অনুভূতির জটিল রূপও বলে অ্যাখ্যায়িত করেছেন। মনোবিজ্ঞানীরা আবেগ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, আবেগের উদ্ভব ঘটে কোন ভাব বা ধারণা থেকে। প্রত্যক্ষণ করার পর বিষয়টির একটি ধারণা বা ভাব মনে জাগরিত হয় এবং সেই ভাব বা ধারণাটিই আবেগে সঞ্চার করে। আমরা যে অনুভূতির কথা বলছি, সেই অনুভূতি কিন্তু শারীরিক বা মানসিক দুটাই হতে পারে। তবে আবেগ শুধু মানসিক।
আমরা অনেকে অনেক সময় গল্পের বই পড়তে গেলে কিংবা মুভি দেখার সময় কেঁদে ফেলি। কেন কেঁদেফেলি? কারণ গল্প পড়া কিংবা মুভি দেখার সময় সেই চরিত্রগুলোর সাথে আমরা নিজেদের একাত্ম করে ফেলি। মনে হয় গল্পের বা মুভির চরিত্রগুলো আমরা নিজেরাই। সে জন্য চরিত্রের কষ্ট হয়ে গিয়েছিল আমাদের নিজেদের কষ্ট। আর এই কষ্টই হচ্ছে আবেগ। এটা শুধু আমার কথা নয়, বাংলাদেশের জনপ্রিয় একজন লেখক ও মনোচিকিৎসক মোহিত কামালও তার এক প্রবন্ধে এই কথা বলেছিলেন। অন্তর্জগতের প্রেষণা নাড়া খেলে আবেগের আলোড়ন ওঠে। আমাদের চিন্তা জগতের ভাবনাগুলো নাড়া দিয়ে জাগিয়ে তোলে আবেগ। আমাদের মনের ভেতরের কষ্ট, স্মৃতি আর বাইরের বিষয়টা অনুভব করার কারণে আবেগ জাগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আর তখনই আমাদের ভেতরে যে সুপ্ত কথা মালা, স্মৃতি বা বিষয়গুলো রয়েছে সেগুলো বের করে দেয়। আর সেগুলোকে কেউ গল্প-অনুগল্প কিংবা কেউ কবিতার ছন্দে সাঁজিয়ে তোলেন। বিষয়টা আরো একটু ব্যাখ্যা করা যাক- আবেগ জাগানোর সঙ্গে রয়েছে আমাদের মস্তিস্কের স্বংক্রিয় ¯œায়ুতন্ত্রের সরাসরি সংযোগ। প্রেষণার সঙ্গে আবেগ যুক্ত হলে অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে বেগবান হয় মোটিভেশনাল ফোর্স বা গতি। এই গতি মানুষকে টেনে নিয়ে যায় লক্ষ্যের দিকে। মানুষ সফল হয়। তখনই মানুষ তার আবেগের তাড়নায় ভেতরে থাকা কষ্টগুলো স্মৃতি আকারে গল্প, উপন্যাস, কবিতায় রূপান্তরিত হয়।
আদর্শ ও নীতিবোধ নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত আতিশয্য ও আবেগ প্রবণতা যায় সেন্টিমেন্টালিজমে। একজন নিপুণ কথাশিল্পী শৈল্পিক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করতে পারেন অন্তর্গত সেই সত্যের বাস্তব রূপ। এই আবেগ হচ্ছে মনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বা উপাদান। এই উপাদান অন্তর্গত প্রেষণা ও চিন্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কবি ও সাহিত্যিকদের মধ্যে জাগিয়ে তোলে সাহিত্য সৃষ্টির গতিময় ধারা। আমরা জানি, যথাযথ ভাবে মন জোগান সম্ভব না হলে মনঃসংযোগ তৈরি হয় না, আমাদের মন জাগে না। আমরা দেখেছি আবেগের সাথেও চিন্তনের পারস্পরিক সম্পর্ক। আবেগ বা চিন্তনের যে কোন একটি মনঃক্রিয়া নাড়া খেলে আলোড়িত হয় অন্যটিও। আবেগ ছাড়া পৃথকভাবে মন জেগে ওঠার সুযোগ নেই মনস্তত্বে ও সাহিত্যসৃজনে। মন জাগাতে হলে জোগাতে হবে মনের খোরাক। মনের নানা ধরণের খোরাকের মধ্যে আবেগ হচ্ছে অন্তর্লীন এক বিশেষ উপাদান। শুধু মাত্র সেন্টিমেন্টালিজমে নয়, অতীতকাল থেকে বর্তমানে আলোচিত সব ধরণের সৃষ্টিশীল সাহিত্য নির্মাণে আবেগের রয়েছে দোর্দ- প্রতাপ। আবেগ আলাদা রেখে সাহিত্য হতে পারে না। আর এই কথা বিশ^াস করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যাও। কোন কোন মতবাদে সুনির্দিষ্ট বিশেষ মনঃক্রিয়া প্রাধান্য পেলেও কখনও সাহিত্য সৃষ্টি কিংবা মূল্যায়নে আবেগের স্থানচ্যুতি ঘটেনি কোথাও। সর্বত্রই চিন্তা ভাবনার সঙ্গে আন্তঃসর্ম্পের কারণে সাহিত্যের মূল প্লাটফর্মে রয়েছে আবেগের উজ্জ্বল উপস্থিতি।
গল্পের বা মুভির যে চরিত্র দেখে আমরা কেঁদেছিলাম সে কষ্ট পেয়েছিল। আর আমরা সেই চরিত্রের সাথে নিজেদের একাত্মতা করে কেঁদেছিলাম। অর্থ্যাৎ চরিত্রটির কষ্টে আমরা সমব্যথী হয়েছিলাম। আমরা চরিত্রের আবেগে, চিন্তায়, প্রত্যক্ষণে বিলীন হয়ে গিয়েছিলাম। গল্পগুচ্ছের শব্দের গাঁথুনি বা নাটকের অভিনয় এভাবে চরিত্রগুলোর সাথে পাঠক চিত্তের সংযোগ করে দেয়, পাঠকের মনে জাগায় সহানুভূতি। আর এটিকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ইম্প্যাথি। বাক্য বা শব্দ চোখ দিয়ে মস্তিস্কে চালান করে দিই আমরা। বাক্য বা শব্দটি বিশ্লেষিত হয় আমাদের মস্তিস্কে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাক্য বা শব্দটির অর্থপূর্ণ উপলব্ধি নাড়া দেয় বোধ শক্তি। এটাকে বলা হয় প্রত্যক্ষণ। এই প্রসেসে নাড়া খায় চিন্তন- প্রক্রিয়া, থট প্রসেস। আমাদের মধ্যে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে ওই থট প্রসেস। আর তখনই জেগে উঠে আবেগ। আমাদের মধ্যে নানা ধরণের আবেগ রয়েছে। যেমন, প্রজেটিভ ইমোশন (ভালোবাসা, আনন্দ, সুখ ও শান্তি), নেগেটিভ ইমোশন (রাগ, দুঃখ, কষ্ট) অপোজিট ইমোশন (ভালোবাসা, ঘৃণা), মিশ্র আবেগ ( জেলাসি= ভালোবাসা + রাগ) ইত্যাদি। আবেগের পরিবর্তন, চিন্তন বা থট প্রসেসে নাড়া খাওয়ার কারণে বদলে যেতে পারে আচরণ।
৬ অক্টোবর ২০১৩ সালে স্মিথসোনিয়াম ম্যাগাজিন সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রতিবেদ প্রকাশিত হয়। মার্কিন মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণাটি করেন। গবেষণা প্রতিবেদটিতে বলা হয়েছে, আবেগ আর সাহিত্যের মধ্যে বড় ধরণের সম্পর্ক রয়েছে। যারা সাহিত্য চর্চা করেন তারা অন্যের আবেগ সহজে বুঝতে পারেন। সাহিত্যের পাঠকেরা আবেগহীন পাঠকদের তুলনায় মানুষের অভিব্যক্তি ও অনুভূতি সহজে বুঝতে পারেন।
লেখক: শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ সংবাদ