ধরুন আপনি পরীক্ষায় পাস করেছেন। সাধারণত পরীক্ষায় পাস করলে সবাই খুশি হয়। এরপর স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যেক শিক্ষার্থী সামনে কি করবে, কোথায় কোথায় ভর্তি হবে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে ভালো হয় সেই চিন্তাই করে। অথবা আপনার খুব কাছের বন্ধু কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ভ্রমণ করে ফিরে এসে আপনাকে সেই গল্প বলছে। তখন স্বাভাবিক ভাবেই আপনি মনে মনে বলবেন, ‘আমি কখনো কক্সবাজার যাইনি। যদি কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকতে যেতে পারতাম। স্বাভাবিক ভাবে আপনি তখন মনে মনে কল্পনা করবেন, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার পর প্রথমে সমুদ্রের পানিতে পা ছোঁয়াবেন। তারপর আসতে আততে পুরো শরীরটা ছোঁয়াবেন। এরপর সমদ্রের ঢেউয়ের সাথে সাথে ভেসে বেড়াবেন। আপনার মনে আনন্দের ঢেউ খেলছে।
এখন ভাবুন তো ভাষা যদি না জানতেন, তাহলে আপনি চিন্তা করতেন কীভাবে? আমরা সবাই জানি ভাষা ছাড়া চিন্তা বা কল্পনা করা যায় না। এমনকি স্বপ্ন দেখতেও ভাষা দরকার।
বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, মাতৃভাষাই মানুষকে সহজে চিন্তা ভাবনা করতে শেখায়। মাতৃভাষাতেই মানুষ সবচেয়ে সহজে কল্পনা করতে পারে। স্বপ্ন দেখতে পারে। যার চোখে স্বপ্ন নেই, যার কল্পনা শক্তি নেই, তার জীবন প্রায় অর্থহীন হয়ে যায়।
আমরা ছোটবেলা থেকেই মায়ের মুখে গল্প, ছড়া, গান শুনে শুনে মাতৃভাষায় দক্ষ হয়ে উঠি। যখন আমাদের বয়স এক মাসও না, তার আগে থেকেই মায়ের কোলে মায়ের হাসির সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। মা আমাদের অনেক ছবির বই চোখের সামনে রেখে রূপকথার গল্প শোনান। এভাবে আমরা কল্পনার জগতে চলে যাই। সব মাতৃভাষা কল্যাণে। হলিউডের একটি ইংরেজি মুভি আছে। মূলত মুভিটি এক বছরের একটি শিশুকে কেন্দ্র করে। শিশুর মা প্রতিদিন বিভিন্ন ছবি সংযুক্ত বই পড়াতো তাকে। যেমন, এ তে আপেল, বি তে বল ইত্যাদি। শিশু পরবর্তীতে আপেল ও বল দেখে মায়ের পড়ানো গল্প কল্পনা করে নিয়ে আসে মস্তিস্কে। আর এই সব কিছুই মাতৃভাষার কল্যাণ। মাতৃভাষা ছাড়া সম্ভব না।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের নীতিনির্ধারণী অবস্থানে বলা হয়েছে, জন্মের পর থেকেই পড়াশোনার বিষয়টি প্রাথমিক শিশু পরিচর্যার অংশ হওয়া উচিত। এর অর্থ খুব ছোট বাচ্চাদের ও বই পড়ে শোনানোর গুরুত্ব সম্পর্কে মা-বাবাদের সচেতন হতে হবে।
শিশুর বয়স দেড় দুই মাস হলেই তার চোখের সামনে ছবির গল্পের বই ধরে রেখে ছড়া-গল্প পড়ে শোনানোর তাৎপর্য গভীর। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, এই বাচ্চারা বড় হয়ে অনেক বেশি চৌকস ও বুদ্ধিদীপ্ত হয়। পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ে। জানার প্রতি আগ্রহও বাড়ে। শিশুদের সামনে বই ধরে ছড়া-গল্প শোনালে শিশুরা তা কল্পনা করে।
বিজ্ঞানের কাজ হলো সমস্যাটাকে খুঁজে বের করা। সমস্যা খুঁজে বের করে তার সমাধান করা। আর অন্যকে বোঝানোর চেষ্টা করা। আর এই কাজটি করতে হলে আপনাকে মাতৃভাষা জানা খুব প্রয়োজন। কারণ মাতৃভাষা দিয়ে আপনি যতটা সহজে সারতে পারবেন অন্য ভাষা দিয়ে ততটা সহজ হবে না।
আরেকটা বিষয়, শিশুদের সামনে কখনো ঝগড়া করতে নেই। শিশুদের সাথে সব সময় সুন্দর ব্যবহার করা উচিত। কারণ আপনি শিশুর সামনে যাই ব্যবহার করুন তা কিন্তু শিশুরা ভুলে না। আপনি খারাপ ব্যবহার করতে করতে একদিন দেখবেন আপনার সন্তানটিও খারাপ ব্যবহার করছে আপনার সাথে।
আরো একটি বিষয়। সেটা হচ্ছে, আপনার শিশুকে মাতৃভাষার প্রতি দক্ষ করে তুলুন। কারণ মাতৃভাষা সেই শিশুর অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে আছে। মাতৃভাষায় একটা শিশুকে যা খুব অল্প সময়ে শেখাতে পারবেন অন্য ভাষায় তা হবে কঠিন।
লেখক: শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী























