সাঈদুল আরেফীন।।কবি ও প্রাবন্ধিক
আবারো দ্বারে এসে উপস্থিত বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বাংলা নববর্ষ ১৪২৩। নববর্ষ মানেই উৎসব। নববর্ষ মানেই আনন্দ । নববর্ষ মানেই হলো নতুন বছরকে বরণের ভিন্ন আয়োজন। নববর্ষ হলো বাঙালি শিশু কিশোর বয়সী মানুষ সবার জন্যে ভিন্ন চেতনার একটি সুন্দর সকালের আগমনি বার্তা। প্রতিবছর নববর্ষ আসে শিশুদের মনে আনন্দের ভিন্ন ভিন্ন সৌরভ নিয়ে। নববষের প্রথমদিন বা পয়লা বৈশাখ উদযাপনে শিশুদের মধ্যে থাকে এক ধরণের উৎসব উৎসব ভাবনার ব্যাপার স্যাপার। থাকে নতুন জামা কাপড়ে বাবার হাত ধরে মায়ের সাথে মেলায় যাবার বায়না। সারা শহরময় পয়লা বৈশাখের উৎসব মুখর কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন,মেলায় হরেক রকমের খেলনা ,বেলুন হাতে ঘুরে বেড়ানো,রঙ বেরঙের খাবার কেনার ধুম তো আছেই। সকালে পান্তা ইলিশের স্বাদ নিতে শিশুরাও আজকাল পিছিয়ে নেই। পিঠা পায়েস ফিরনী পোলাও সহ হরেক রকম বাঙালি খাবারে পরিবারের সাথে মিলে মিশে দিনটাকে রাঙাতে চায় প্রত্যেক শিশুই। সারাদেশে নববর্ষের আয়োজন এতোটাই নতুন মাত্রা পেয়েছে যে তা থেকে আমাদের দেশের শিশুরা অনেক বেশি সোচ্চার। তার মানে নববর্ষ এখন আর কারো জানা অজানার বিষয়ে থেমে থাকেনি। নববর্ষ সকল বাঙালি শিশু কিশোর ছেলে বুড়ো সবার জন্যে আনন্দের, ভালোবাসার এক সুন্দর বরণীয় দিন হিসেবে পরিগণিত হয়ে ওঠেছে। গত দশক আগেও যা ছিলো অনেকের কল্পানার বাইরে, সেটা আজ সকল বাঙলাদেশের নাগরিকের মনে ও চেতনায় ধারণ করেছে ভিন্নমাত্রায়। যা ছিলো টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠা রঙিন উৎসব। তা আজ নগর ,গ্রাম ,পাড়া ,মহল্লা ছাপিয়ে ধর্ম অধর্ম সব সপ্রদায়ের চিরচেনা সম্প্রীতির উৎসবে পরিণত হয়ে ওঠেছে। তা থেকে তো আমাদের শিশু কিশোরো পিছিয়ে থাকতে পারে না। শিশুরাও ছুটে চলে উৎসবের কিনারে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তারাও মিলে মিশে বর্ষবরণের উৎসবটা আনন্দময় করে নিতে চায়। সারাবছরের চাপ তাপ গ্লানি দূর করে আগত দিনগুলো যাতে তাদের জীবনে ও হয়ে উঠতে পারে উন্নতির সোপান। নববর্ষকে ঘিরে রচিত কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত সুরময় গান এসো হে বৈশাখ এসো এসো গানের তালে তালে সবাই হারিয়ে যায় এদিনটিতে। কারণ এ গানে গানে সকল পুরনো জরাজীর্ণতাকে ডিঙিয়ে নতুন সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ঠিক এমনি করেই কবিগুরু শিশুকিশোরদের জন্য বৈশাখের প্রসঙ্গ টেনে আনে এভাবে , আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
সবার মনে প্রশ্ন আসতে পারে ,এতো উৎসবময় বর্ণালি এই নববর্ষ কীভাবে আমাদের জীবনে সম্প্রীতির দেয়াল গড়ে দিয়েছে। যুগ পরম্পরায় বাঙালি জাতি বরাবরই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে থেকে নববর্ষের মতো সকল ধর্মীয় আচার আচরণ ও উৎসব পালন করে এসেছে। সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে সে উৎসবে যোগ হয়েছে ভিন্নমাত্রা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে সাড়ম্বরে দিবসটি পালনের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন,উড়িষ্যার বিখ্যাত ঐতিহাসিক কাশিপ্রসাদ জয়সোয়াল এর মতে ,সম্রাট আকবরই বাঙলা নববর্ষের মূল প্রবর্তক। ইতিহাসবিদদের মতে,বাঙালির জন্যে এ বাঙলা সনের গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম। বিশেষ করে তখনকার কৃষিনির্ভর বাঙলাদেশে গ্রামীন জীবনযাত্রায় উৎপাদনকে কেন্দ্র করে এ ফসলী সনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিলো। জানা যায় ,তৎকালীন ভারতের নদীর তীর ঘেষে গড়ে ওঠা কৃষিজীবনের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে ঋতুভিত্তিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায়। আর তাতে করে নির্ভুল হিসাবের জন্যে পঞ্জিকার সম্পর্ক, যত্ন সহকারে ফসল বোনা, ফসল কাটা, সময় ধরে ফসলের যত্ন ও পরিচর্যা করা সবকিছুই নির্ভর করতো এই ফসলী সনের মাধ্যমে। তাতেই ফসলী সনের উপযোগিতা শেষ হয়নি। এই ফসলী সনকে ঘিরে উদযাপিত হতে থাকে বারো মাসে তের পার্বণ। হতে থাকে হরেক রকমের মেলার আয়োজন। যা পরবর্তীতে ফসলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধর্ম অধর্মকে ভেদ করে সকল বাঙালির জন্যে যা হয়ে ওঠে পারিবারিক সামাজিক বন্ধনের অন্যতম উৎসব। এখন তো ঢাকার রমনা বটমূল ছাপিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নববর্ষ নতুন উৎসাহে উদ্দীপনায় পালিত হয় সেই সময়কালে পিঠা,পুলি খাওয়া ,নতুন ধানের উৎসরে সঙ্গে হরেক রকমের মেলা আয়োজনই কেবল নয়,নববর্ষকে সামনে রেখে যাত্রা ,কবি গান,জারি সারি, রামায়ণ,গম্ভীরা ,কীর্তন পালার আসর , ষাড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, লাঠি খেলা, দাঁড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট,হা-ডু-ডু,বলী খেলার আয়োজন হতে থাকে। গ্রামীণ শিশু কিশোরদের জন্য বিশেষত্ব হয়ে ধরা দিত নাগরদোলা, পুতুল নাচ, সার্কাস,আলতা, পুঁতির মালা, বাঁশি, কাঠি, কদমা, হাও্য়াই মিঠাই। সেই সাথে মেলায় পসরা সাজিয়ে নানা ধরনের তৈজসপত্র সারা বছরের দুষ্প্রাপ্য জিনিসপত্র, মৃৎশিল্প, কারুপণ্যের সমাহারে এখানে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মহাসম্মিলন ঘটতে থাকে শান্তিপ্রিয় বাঙালির জীবনে। ঐতিহাসিকেরা দাবী করেছেন ,এ সংস্কৃতি বা আচার আচরণগুলো সংকর বা মিশ্র সংস্কৃতিরই বহি:প্রকাশ। যাতে সময়ের প্রেক্ষিতে গ্রামীণ হিন্দু, বৌদ্ধ, আদিবাসী ও মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে মেলবন্ধন গড়ে দিয়েছিলো।
ইতিহাসের পথ ধরে বর্তমানে বাঙলা নববর্ষ যে কতোটা গুরুত্ববহ তা সারাদেশের মতো চট্টগ্রামও বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে শিশু কিশোরদের কাছে। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে ঐতিহ্যগত ডিসিহিলে যেমন বিশাল মেলা অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনী সকল পর্যায়ের মানুষের সমাগম ঘটে তেমনি সিআরবি নববর্ষের মেলাতেও প্রাণের ছোয়া লেগেছে। নববর্ষে বা পয়লা বৈশাখকে ঘিরে এ দুই বিশাল আয়োজনের বাইরে ও চট্টগ্রামের গ্রাম গঞ্জে প্রদর্শনী মেলা বলী খেলা ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে পুরো বৈশাখ ব্যাপী। সেই সাথে শতবর্ষ অতিক্রান্ত লালদীঘির ঐতিহাসিক আবদুল জব্বারের বলীখেলা তো জগৎ বিখ্যাত আয়োজন। সব উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্যেই নিহিত আছে বাঙালির সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক মানসিকতারই প্রতিচ্ছবি। ফলে বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষকে কেন্দ্র করে আজকের শিশু কিশোর স সকল মানুষের মনে ধারণ করতে হবে সেই সম্প্রীতিময় বাঙলাদেশের চেতনাই।
লেখক: কবি,প্রাবন্ধিক, গশিক্ষা ও উন্নয়ন গবেষক
























