১২ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ধুমপান ও মাদক সেবন কি আলাদা বিষয়- আকাশ ইকবাল

এক. আজ একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। ধুমপান ও মাদক সেবন করা কি দুটো আলাদা আলাদা বিষয়? এই প্রশ্নটি আমি অনেক ধুমপায়ী ও মাদক সেবনকারীকে করেছিলাম। কিন্তু তারা সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। তারা উত্তরে বলেছিল, দুটো আলাদা বিষয়! এই প্রশ্নটি কয়েকজন নামে সচেতন নাগরিককেও করেছিলাম। কিন্তু তাদের বক্তব্যে এটাই বুঝতে পেরেছি যে, ধুমপান ও মাদক আলাদা। অর্থ্যাৎ ধুমপান ও মাদক সেবন দুটো আলাদা বিষয়। আসলে কি তাই? না। দুটোই এক। ধুমপান ও মাদক সেবনে রয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক। কারণ, পৃথিবীতে যত মাদকাসক্ত ব্যক্তি আছে, তারা প্রত্যেকেই প্রথম ধুমপান দিয়ে শুরু করেছেন। কেউ আগে মদ-গাজা বা হেরোইন খেয়ে মাদকাসক্ত হয়না। মাদক যেমন, মদ-গাজা, ইয়াবা-হেরোইন ইত্যাদি। মাদকের গায়ে লেখা থাকে না ‘মাদক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’। তবে আমরা সবাই জানি মাদক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কিন্তু সিগারেটের প্যাকেটের গায়েই লেখা থাকে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ ‘ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’। ক্ষতিকর জেনেও পান করে। এটাকে আবার তারা আধুনিকতা বলে মন্তব্য করে ! আবার কেউ কেউ মনের ভেতর জমে থাকা দুঃচিন্তা দূর করার ওষুধ হিসেবে পান করে! আমরা জানি রোগ হলে ওষুধ সেবন করতে হয় নিরাময়ের জন্য। রোগ নিরাময়ের জন্য ক্ষতিকর কিছু সেবন করা হয় না। এখন হয়তো অনেকের মনে প্রশ্ন জাগবে, তাহলে ইউরোপ আমেরিকায় ডাক্তাররা গাজাকে স্বাস্থ্যের জন্য উপকার বলেছেন কেন? যেখানে গাজাও একটা মাদক। হ্যাঁ, আমি আপনার কথার সাথে একমত। কিন্তু আপনি ভুল বুঝে আছেন। আপনি যেখানে পড়েছেন বা যার কাছে শুনেছেন সে কি এটা বলেনি, পরিমাণ মতো খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকার? হুম। গাজা পরিমাণ মতো খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকার। কিন্তু ইচ্ছে মতো দুঃখ ভুলার জন্য সেবন করা উপকার নয় বরং ক্ষতি। আমি যখন গাজা সেবনকারীদের প্রশ্ন করে ছিলাম, তখন তারা আমাকে পাল্টা এই প্রশ্নটি করেছিল। যদিও প্রমাণ সহকারে তাদের বুঝিয়েছি।
দুই. ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, একথা আজ শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞান নয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও হুসিয়ারি সংকেত। ধুমপানের ক্ষতিকর দিক উপলব্ধি করে এক প্রখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী বলেছেন, ‘উৎরহশ ঢ়ড়রংড়হ নঁঃ ষবধাব ংসড়শরহম’ অর্থ্যাৎ ধুমপান বিষপানের চেয়েও মারাত্মক। কারণ বিষপানের সাথে সাথে জীবনের মৃত্যু ঘটে কিন্তু ধুমপানের ফলে মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মরে। এর ফলে সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয় ঘটে। ব্যক্তি সমাজ নিশ্চিত অকল্যাণের দিকে ধাবিত হয়। যা এক সময় মাদকাসক্তে পরিণত হয়। ধূমপান স্বাস্থ্য রক্ষা, শরীর গঠন ও নানা প্রকার রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অপকার ছাড়া কোন উপকার করে না, এই কথার প্রমাণ আমরা প্রতিনিয়তই দেখি। আমার এক বন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলাম, দোস্ত তুই কেন ধুমপান করিস? উত্তরে সে আমাকে বলেছিল, ধূমপানের ফলে শরীর শিথিল ও মনোরম হয়, নিজেকে চিন্তা মুক্ত রাখি, একঘেয়েমী কাটাতে ধূমপান সাহায্য করে। আর তুই তো জানিস সিগারেট স্মার্ট ছেলেরা খায়। আমার বন্ধুর উত্তরে আমি বুঝতে বাকি রইল না যে, সে ধুমপানের মধ্যে ইতিবাচক দিক রয়েছে বলে বুঝাচ্ছে। কিন্তু আমি আজ পর্যন্ত ধুমপানে কোন ইতিবাচক দিক খুঁজেই পেলাম না। আমার এক বড় ভাই, খুবই সচেতন মানুষ। কয়েকদিন তাদের সংগঠনের উদ্যোগে মাদক বিরোধী আলোচনা সভা ও মাদক বিরোধী একটি ইউনিয়ন কমিটি করেছেন। তাঁর কাছেও আমার প্রশ্ন ছিল, ভাই আপনারা কয়েক দিন আগে মাদক বিরোধী কমিটি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন। মরণঘাতী মাদকের বিভিন্ন ক্ষতিকারক দিক গুলো সবার সামনে তুলে ধরেছেন। কিন্তু আপনি নিজেই মাদক ছাড়তে পারেননি। অর্থ্যাৎ সিগারেট খাওয়া বন্ধ করেননি। তার বক্তব্যে এটা বুঝতে পেরেছি, তিনিও সিগারেটকে মাদক বলে মনে করেন না। তিনিও আমার বন্ধুর মতো সিগারেটের ইতিবাচক দিকের কথা বলেছেন। যদিও নেতিবাচক দিকের কথাও স্বীকার করেছেন। ওনার মতো এমন হাজারো সচেতন মানুষ আছেন যারা নিজেরাই ধুমপান করে নিজেদের শরীরের ক্ষতি করে ও ধুমপান করার মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করে মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলে। কিন্তু তারা নিজেরাই চিন্তা করে না মাদক যতটা ক্ষতিকর ততটাই ক্ষতিকর ধুমপানও। শুধু মাদক যুব সমাজকে নষ্ট করে না। ধুমপানও যুব সমাজকে নষ্ট করে। ধুমপান যুব সমাজকে মাদক সেবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সিগারেট ও মাদক দুটো আলাদা কোন বিষয় নয়। ধুমপান ও মাদক, এই বিষয়ে ইন্টারনেটে তেমন কিছু খুঁজে না পেলেও আমি দুএকজন চিকিৎসকের সাথে কথা বলেছি। তারা মনে করেন, ধুমপান ও মাদক দুটো এক। ধুমপান ও মাদক দুটো যে আলাদা বিষয় না তা এগুলোর ক্ষতিকর দিকগুলো আলোচনা করলেই সু-স্পষ্ট হয়ে যাবে।
তিন. ধুমপান ও মাদক সেবনে প্রধান তিনটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে, ১) শারীরিক ২) আর্থিক) ও ৩) পরিবেশগত। সিগারেটের ধোঁয়া যেহেতু কোন তরল পানিয় নয় সেহেতু কালো ধোঁয়াগুলো শরীরিরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যেখানে সর্বগ্রাসী থাবা দিয়ে আক্রমণ করে না। কয়েক বছর আগে নেদারল্যান্ডে সাত হাজার ব্যক্তির কিডনির ওপর ধূমপানের প্রভাব বিষয়ে গবেষণা হয়। এতে প্রতীয়মান হয় ধূমপায়ীদের শরীরে ক্রিয়েটিনিনের পরিমাণ অনেক বেশি। ধূমপায়ীদের প্র¯্রাবে অ্যালবুমিনও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রায় পাওয়া গেছে। এ দু’টি কিডনি ধ্বংসের প্রাথমিক লক্ষণ। মাদকের কারণেও খুব দ্রুত কিডনি নষ্ট হয়ে যায়।
চার. মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের জন্য সিগারেটকে সব নেশার ‘মা’ বলা হয়। উইকিডিয়াতে সু-স্পষ্ট ভাবেই লিখা আছে, শুধু ধুমপান বা তামাক সেবনে প্রতিবছর সারা বিশে^ প্রায় চার মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়। তাছাড়া ধুমপানে শিশুদের মারাত্মক ক্ষতি করে। ধুমপানের কারণে শিশুর নিউমোনিয়া, ব্রংকিওলাইটিস, ব্রংকাইটিস, হাঁপানি ইত্যাদি রোগ হতে পারে। একটি জরিপে দেখা গেছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবছর তিন লাখ শিশু পারিপাশির্^ক ধুমপানে নিউমোনিয়া ও ব্রংকাইটিসে ভোগে। আর যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর পারিপাশির্^ক ধুমপানের কারণে ১৭ হাজার শিশু বিভিন্ন রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়। আমাদের দেশের ধুমপায়ীরা হয়তো জানে না, তাদের কারণে হাজার তাদের সন্তানরাও বিভিন্ন রোগে ভোগেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ অনেক সচেতন মানুষও ধুমপানকে আধুনিকতার বহ্নিপ্রকাশ বলে মনে করেন। যেখানে ধুমপান গাজার থেকেও ক্ষতিকর। সেই বস্তুটিকে সবাই পকেটে নিয়েই হাটে। অন্যান্য মাদক দ্রব্য কষ্ট করে ছেড়ে দেওয়া যায়, কিন্তু ধুমপান বা সিগারেট খাওয়া এমন একটি নেশা যা ছাড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আমি দেখেছি, যে মানুষটির এই পৃথিবীতে এক হাত থাকার জায়গা নেই, যে মানুষটি সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে খায়, যে মানুষটি এক বেলা না খেয়ে কাটায় সেই মানুষটিও একদিন ধুমপান না করে থাকতে পারে না। এবার ঠান্ডা মাথায় একবার চিন্তা করুণ ধুমপান আর মাদক দুটো আলাদা বিষয় নয়। বলা যায়, গাজার মতো একটা কঠিন মাদকের চেয়েও ধুমপান ক্ষতিকর। মাদক ক্ষতিকর তাই আইনি ভাবে নিষিদ্ধ, ধুমপানও ক্ষতিকর হলেও আইনি ভাবে নিষিদ্ধ না কেন? কারণ সিগারেট কোম্পানীগুলো সরকারের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন করা। মাদকের মতোও যদি তামাক চাষ বা সিগারেট আইনি ভাবে নিষিদ্ধ করা হয় তাহলে ধুমপান করা মাদকের মতো অনেকটা কমে যেত।

লেখক: শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ সংবাদ