সানি সূত্রধর, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি ঃ
কিশোরগঞ্জে হাওরের অন্তত ৩৫টি ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামতের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। উজান থেকে আসা পানির তোড়ে এসব বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ফসলহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরপ্রধান উপজেলা ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইনে এবার ৪৮ হাজার ৫৬৭ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়।
হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন হয়েছে ১৫০ মণ। এরই মধ্যে ৩৫ ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে। তবে হাওরের দুঃখ, আগাম বন্যা, উজানের পানি ও পাহাড়ি ঢল। এ তিনটির একটি হলেই ফসল ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। এমন বাস্তবতায় স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি বিভাগ ফসল রক্ষায় মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণে উদ্যোগী হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাওরের বেশির ভাগ বাঁধ ১৫-২০ বছর আগের। কিছু আছে ৩০-৪০ বছরের পুরোনো। নির্মাণের পর থেকে অধিকাংশেরই সংস্কার করা হয়নি। এবার টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। ২১ এপ্রিল মিঠামইনে হিরাজুড়ি বাঁধ ভেঙে প্রায় ২০০ একর জমি তলিয়ে যায়।
সর্বশেষ উজানের পানির তোড়ে ৯ মে রাতে মিঠামইনের সানকি ও হাসিমপুর বাঁধ ভেঙে যায়। সানকি ও হাসিমপুর বাঁধ দুটি নির্মাণ করা হয় ২০০৭ সালে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় তিন কিলোমিটার। সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সংস্কার না হওয়ায় বেশ কিছু স্থান থেকে মাটি সরে বাঁধটি দুর্বল হয়ে গেছে। এর আগে আরও তিনবার এই দুই বাঁধ ভেঙে ফসলহানি হয়েছিল।
হিরাজুড়ি বাঁধ আগে এবং এবার ধসে যাওয়ার কারণ একটাই—সংস্কারের অভাব। বাঁধটি নির্মিত হয় ৩১ বছর আগে। একই কারণে মিঠামইনের বড় বাঁধের মধ্যে কাঠখাল, কালিপুর, চরঢাকি বাঁধ ঝুঁকিতে আছে। এ তিনটি বাঁধের বহু জায়গায় মাটি সরে এখন সরু হয়ে গেছে। প্রতিটি বাঁধে চার থেকে পাঁচবার ভাঙন দেখা দেয়। মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহিনুর রহমানও একই আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, স্থানীয় সাংসদের সঙ্গে কথা হয়েছে। ইটনার বাঁধগুলোর মধ্যে চন্দ্রপুর উপকেন্দ্র বাঁধ, রায়টুটি দারা বাঁধ, এলেংজুড়ি কুরের খাল বাঁধ, বাদলা ও শৈলা বাঁধ, শিমলার পিয়ারা বাঁধ নির্মাণের ২০ বছর পেরিয়ে গেছে। সমস্যা বুঝতে পেরে কৃষকেরা এবার নিজেরা চাঁদা তুলে জরুরি স্থানে মেরামত করেছেন।
তারপরও নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। উপজেলার চরঢাকি গ্রামের কৃষক কুতুব মিয়া, সাফু মিয়া ও তাজুল খান বলেন, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রধান প্রতিশ্রুতি থাকে বাঁধ মেরামত। কিন্তু ফল হয়ে যাওয়ার পর যে লাউ সেই কদু। ইটনার কাঠখাল ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান শরীফ বলেন, মাঝেমধ্যে জরুরি প্রয়োজনে টিআর, কাবিখা প্রকল্পের বরাদ্দ দিয়ে ঠেকা কাজ চালানো হয়। তবে বাঁধগুলোর যে অবস্থা, সরকারি বড় পরিকল্পনা ছাড়া সমস্যা সমাধানের উপায় নেই। অষ্টগ্রামের ১৫টি বাঁধের মধ্যে আবদুল্লাহপুর বাঁধটি দৈর্ঘ্যে ছয় কিলোমিটার আর দেউঘর বাঁধ চার কিলোমিটার।
দুই যুগ পার হয়ে গেলেও এই দুটি বাঁধ মেরামত করা হয়নি। আগাম বন্যা হলে বাঁধগুলো ভাঙতে পারে বলে মন্তব্য করেন অষ্টগ্রামের ইউএনও মোহাম্মদ মহসীন উদ্দিন।তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, ইটনা ও অষ্টগ্রামে পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের উপ-প্রকল্পের আওতায় আটটি ডুবো বাঁধ নির্মাণ করেছে। আটটি বাঁধের দৈর্ঘ্য ২৭ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার। দপ্তরটির সহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো বাঁধ ঝুঁকিতে নেই।’ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, তাদের বিভাগ থেকে শুধু ইটনা উপজেলায় তিনটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শাহজাহান বলেন, তাঁদের বাঁধগুলোও ভালো আছে।
























