[ad id=”28167″]
তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া আপিল বিভাগের রায়ের পুনঃশুনানি দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন। সোমবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে নিজ চেম্বারে সাংবাদিকদের কাছে এ দাবি তুলেন তিনি।
অবসরের পর সাবেক প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন ও আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর ১৬৮ মামলার লেখায় তা পুনঃশুনানি করা হচ্ছে। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগের রায়টিও ১৬ মাস পর স্বাক্ষর করা হয়েছিল। এ কারণেই খন্দকার মাহবুব হোসেন ওই মামলাটির পুনঃশুনানির দাবি করে বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই যদি সিদ্ধান্ত হয় (অবসরের পর রায় লেখা অবৈধ), তাহলে একইভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধ বলে দেয়া রায়ও পুনঃশুনানি করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বৈধ বলে হাইকোর্টের স্পেশাল বেঞ্চ রায় দিয়েছিল। সেই রায়টি খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের তিনজন বিচারক অবৈধ ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, “এই রায়টি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের অবসরের ১৬ মাস পর স্বাক্ষর করেন। একজন আইনজীবী হিসেবে আমরা আগেও বলেছি, অবসরে যাওয়ার পর খায়রুল হক যে রায় স্বাক্ষর করেছেন সেটি অবৈধ। আমরা আশা করছি বর্তমান প্রধান বিচারপতি এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট মতামত দেবেন। এবং আমরা মনে করি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে যে রায় দেয়া হয়েছিল, সেটা অবৈধ রায়। এটাও পুনঃশুনানি হওয়া উচিত।”
অবসরে যাওয়া বিচারপতিরা শপথের মধ্যে থাকেন না উল্লেখ করে খন্দকার মাহবুব বলেন, “অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখা হয়েছে এ কারণে ১৬৮ মামলা পুনঃশুনানি হবে। যেহেতু সংবিধানের আলোকে অবসরের পর বিচারপতির শপথ বহাল থাকে না এবং তিনি সাধারণ নাগরিকের মতো হয়ে যান, তাই তাদের রায় অবৈধ। একইভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা খায়রুল হক সাহেবের রায়ও অবৈধ।”
উল্লেখ্য ২৮ এপ্রিল অবসরে যাওয়ার পরে রায় লেখায় সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের ১৬১টি মামলা পুনঃশুনানির সিদ্ধান্ত নেয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেনের ৬টি মামলাও আবার শুনানি হবে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এ সিদ্ধান্ত নেন। তবে একে প্রতিহিংসামূলক ও বেআইনি সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন বিচারপতি মানিক। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আগামী ৩ মের আপিলের কার্যতালিকায় মামলাগুলো পুনঃশুনানির জন্য এসেছে।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চের কার্যতালিকায় ১৬৯ থেকে ২৭৪ ক্রমিকে বিচারপতি মানিকের কাছে রায় লেখার অপেক্ষায় থাকা মামলাগুলো পুনঃশুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। আর বাকি মামলাগুলো আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহাব মিয়ার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে পুনঃশুনানির জন্যে এসেছে।
তবে এসব মামলার বেশিরভাগেরই রায় লেখার কাজ শেষ করেছিলেন বিচারপতি মানিক। কিন্তু তার লেখা রায় গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় প্রধান বিচারপতি মামলাগুলো পুনঃশুনানির নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরপরই প্রস্তুত করা হয়েছে এসব মামলার পেপারবুক।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রধান বিচারপতির একান্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘২৬ এপ্রিল এসব মামলার পুনঃশুনানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
তবে কবে নাগাদ মামলাগুলো কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে তা তিনি নিশ্চিত করেননি।
তবে আপিল বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, সুপ্রিমকোর্টের অবকাশের পর আগামী রবিবার থেকে আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম চলবে। ওই দিনের দৈনন্দিন কার্যতালিকাতেই মামলাগুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৬১টি মামলার মধ্যে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের এক নম্বর আদালতের কার্যতালিকায় ১০০টি এবং বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞার নেতৃত্বাধীন দুই নম্বর আদালতের কার্যতালিকায় বাকি ৬১টি মামলা পুনঃশুনানির জন্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
২০১৫ সালের এক অক্টোবর আপিল বিভাগ থেকে অবসরে যান বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। অবসরে যাওয়ার সময় ১৬১টি মামলার রায় লেখার দায়িত্ব ছিল এই বিচারপতির। এসব মামলা তার অবসরে যাওয়ার আগেই আপিল বিভাগ বিভিন্ন সময়ে শুনানি গ্রহণ সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত আদেশও জানিয়ে দেন। শুধু পূর্ণাঙ্গ রায় লেখার কাজ বাকি ছিল। মামলাগুলোর রায় দীর্ঘদিনেও তিনি না লিখে কালক্ষেপণ করছিলেন।
আর এমনই এক পরিস্থিতিতে বর্তমান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা গত ১৭ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এক বাণীতে অবসরের পরে রায় লেখাকে সংবিধানপরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেন।
ওই বাণীতে তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো বিচারপতি রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন। আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের পর দীর্ঘদিন সময় ধরে রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধানপরিপন্থী।’
অবসরের পর রায় লেখা বেআইনি বলার ব্যাখ্যায় বিচারপতি সিনহা তার বাণীতে বলেন, ‘কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তার গৃহীত শপথও বহাল থাকে না।
এরপর গত ২২ জানুয়ারি মৌলভীবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভায় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচারপতিদের অবসরে যাওয়ার পর আর কোনো রায় লিখতে দেয়া হবে না। আমাদের দেশে অতীতে এ রকম রায় দিলেও এখন থেকে আর এ সুযোগ দেয়া যাবে না।’
এরপর তীব্র সমালোচনার মুখে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক গত ৮ ফেব্রুয়ারি ৬৫টি মামলার রায় ও আদেশের কপি হাতে লিখে জমা দেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি আরো কিছু রায় লিখে জমা দেন। বিচারপতি মানিক তার কাছে আর কোনো মামলায় রায় লেখার কাজ বাকি নেই বলে তখন মিডিয়ার কাছে দাবি করেছিলেন।
তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আরো কিছু মামলার রায় লেখার অপেক্ষায় ছিল। আর যেসব রায় তিনি হাতে লিখে জমা দিয়েছেন, সেগুলোর অনেক লেখাই অস্পষ্ট। পাশাপাশি আপিল বিভাগের যে বেঞ্চ হতে এসব মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে, সেই বেঞ্চের অপর বিচারপতিরা এখনও এসব রায়ে স্বাক্ষর করেননি।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো মামলার রায় লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারপতি রায়টি লেখার কাজ শেষ করার পর অন্য বিচারপতিরা তা দেখে একমত হয়ে স্বাক্ষর করেন। আর বেঞ্চের সব বিচারপতির স্বাক্ষর শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেটি রায় হিসেবেও গণ্য হয় না।
যেসব মামলা পুনঃশুনানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এগুলোর মধ্যে ২০১৩ সালে রায় ঘোষণা করা হয়েছে এমন মামলাও রয়েছে। এছাড়াও অবসরের পরে লেখা রায়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এখন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রধান বিচারপতি সবগুলো মামলারই পুনঃশুনানির আদেশ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এসব মামলায় রায় ঘোষণার পর আবারো পুনঃশুনানির উদ্যোগ নেয়ায় বিচারপ্রার্থীদের বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হবে। সময় ও অর্থের অপচয় হবে। তারপরও রায়গুলো আইনসিদ্ধ করতে ও বিতর্ক এড়াতে প্রধান বিচারপতি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন কেউ কেউ।
সম্প্রতি আপিল বিভাগের একটি পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে ব্যতিক্রমী মামলার ক্ষেত্রেও রায় ঘোষণার ছয় মাসের মধ্যে তাতে বিচারককে সই করতে হবে।
অবসরের পর রায় লেখা নিয়ে সাম্প্রতিক তুমুল বিতর্কের মধ্যে পেশাগত অসদাচরণের কারণে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারক সৈয়দ শাহিদুর রহমানকে অপসারণের সিদ্ধান্ত বহাল রেখে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ মত এসেছে।
সম্প্রতি ১০৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত হয়েছে। এতে রায়ে বিচারকদের আচরণবিধি বিষয়ে ৪০ দফা উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ের শেষাংশে বিচারকদের আচরণ বিধি বিষয়ে ষষ্ঠ দফায় বলা হয়, ‘একজন বিচারক আদালতের বিচার কাজ দ্রুত শেষ করবেন; রায় বা আদেশ প্রদানে অথযা বিলম্ব পরিহার করবেন। ব্যতিক্রমী মামলার ক্ষেত্রেও রায় ঘোষণার ছয় মাসের বেশি নয়, এমন সময়ের মধ্যে সই করবেন।’
























