১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গ্রীষ্মকাল ও মর্নিং স্কুল

লিটন দাশগুপ্ত

 উপরের শিরোনামটি কেবল কোন একটি লেখার শিরোনাম নয়, এটি একটি আবেদনও বটে। অর্থাৎ, বিষয়: মর্নিং স্কুল এর জন্যে আবেদন। এটাই হচ্ছে আমার লেখার শিরোনামের মূল বক্তব্য। যাহোক, এবার আসি সেই বক্তব্য বা আবেদনের কথায়।
বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য দুই মাস আমাদের দেশে গ্র্ষ্মীকাল, কথাটি আমরা সবাই জানি। ষড়ঋতুর বৈচিত্রের এই বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। একই সাথে গ্রীষ্মের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে  আমরা সবাই কম বেশী অবগত। যেমন- গ্রীষ্মে জারুল, সূর্যমুখী, অপরাজিতা, কৃষ্ণচুড়া  ইত্যাদি ফুল ফুটে; আম, লিচু, জাম, কাঠাল ইত্যাদি ফল পাওয়া যায়। আবার ঢেড়স, কড়লা, ঝিঞা, পটল জাতীয় বিভিন্ন রকমের  সব্জীও পাওয়া যায়। এই গুলো আমরা অনেকে জানি, আবার অনেকে জানিনা। অনেক ক্ষেত্রে জানার প্রয়োজনও পড়ে না। তবে গ্রীষ্মকালে প্রচন্ড তাপদাহ বা তীব্র গরমের কথা শিক্ষিত-অশিক্ষিত,  ধনী-দরিদ্র, বড়-ছোট  সবাই জানি। অস্বাভাবিক গরমের এই সময়টাতে  বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় বা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশী থাকে। সেই জন্যে বাড়তি কিছু সতর্কতার প্রয়োজন পড়ে। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিরোনামের প্রেক্ষাপটে এখন বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিশুদের নিয়ে আলোচনা করি। ৫ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের জন্যে, বিদ্যালয়ে ভর্তিকৃত শিশু শিক্ষার্থীদের বয়স সাধারণত: ৬+ থেকে ১০+ এর মধ্যে নির্ধারিত। আবার প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি কক্ষে ৪/৫ বছর বয়সের শিশু আসা যাওয়া করে। বিদ্যালয়ের সময়সূচি সকাল ৯.৩০মিনিট হতে বিকাল ৪.১৫মিনিট পর্যন্ত। দিনের বেলায় এই সময়টাতে তাপমাত্রা থাকে খুবই বেশী। এই অবস্থায়, রোদের মধ্যে কচিকাঁচা শিশু বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া ও অবস্থান করা কতটা কঠিন তা বাস্তবতার সাথে সম্পৃক্ত না হলে,  দুর থেকে বুঝা বা অনুভব করা সহজ নয়। এইখানে  দেখা যায়, সচেতন অনেক অভিভাবক এই সময়টাতে তাদের প্রিয় সন্তানকে বিদ্যালয়ে প্রেরণের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবে অনীহা প্রকাশ করে। ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি হার খুবই কম থাকে। বাধ্য হয়ে যারা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়, তীব্র গরমে তাদের শিখনের আগ্রহ থাকেনা। কারণ শিখনে কিছু শর্ত থাকে, এই শর্তগুলো পূরণ না হলে শিখন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়।

এখানে শহরকেন্দ্রিক বিদ্যালয় গুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও গ্রামের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। আবার বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও লোডশেডিং এর কারনে, প্রয়োজন সময়ে বিদ্যুৎ থাকেনা। অথচ বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রমের সময়সূচী, গ্রীষ্মকালীন সময়টাতে  মাস খানেকের জন্যে দিনের অগ্রভাগে এগিয়ে আনলে, শিখন-শেখানো কার্যক্রম যেমন ফলপ্রসু হয়, একই সাথে বিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীর মাঝেও  বৈচিত্রতা আসে। যা অতীতের মর্নিং স্কুল চলাকালীন সময়টা এর সাক্ষ্য বহন করে।
এইদিকে আগেই বলেছি, বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য দুই মাস গ্রীষ্মকাল। এই দুই মাস মানে ৬০  দিন। আবার গরম কিন্তু বৈশাখের ১ তারিখ শুরু হয়ে জৈষ্ঠ্য মাসের ৩০ তারিখ শেষ হয়ে যায়না। কমপক্ষে বৈশাখের ১৫ দিন আগে থেকে এবং জৈষ্ঠ্যের ১৫ দিন পরেও গরম অনুভব হয়। তার মানে প্রায় ৯০ দিন বা ৩ মাসের মত গরমকাল থাকে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, চলতি বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গ্রীষ্মকালীন অবকাশ নির্ধারিত আছে ৬ দিন, যেখানে শব-ই-বরাত ও বৌদ্ধ পূর্ণিমার ছুটিও এই গ্রীষ্মকালীন অবকাশের মধ্যে অর্ন্তভুক্ত । এখানে উল্লেখ্য, গত বছর প্রাথমিক শিক্ষার একাডেমিক ক্যালেন্ডারে, গ্রীষ্মকালীন ছুটির যে দিন গুলো নির্ধারন করা ছিল, ছুটির দুই দিন পূর্বে হঠাৎ ঘোষনা দিয়ে, শ্রান্তি বিনোদন ভাতা ও বিভিন্ন অজুহাতে সেই ছুটিও বাতিল করা হয় এবং রমজানের ছুটির সাথে সমন্বয় করা হয়।

যাহোক, এবার আসি আমার আবেদনের মূল কথায়। এতক্ষন পর্যন্ত যা বলেছি তার প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারনী মহলের অবগতি ও সিদ্ধান্তের জন্যে জানাচ্ছি যে, প্রতিবছর মে মাসের ২ তারিখ হতে   (যেহেতু ১ মে আর্ন্তজাতিক শ্রমদিবসের ছুটি থাকে তাই ২ তারিখ বলছি) ৩১ মে পর্যন্ত মর্নিং স্কুল দেয়া খুবই প্রয়োজন এবং যা কচিকাঁচা শিশু শিক্ষার্থীর একান্ত মনের দাবী। একই সাথে, যাতে কোন বিভ্রান্তি না হয়, সে জন্যে সেটা প্রতিবছর একাডেমিক ক্যালেন্ডারের সাথে সংযুক্ত করে দিতে হবে। ছুটির তালিকায় যে অংশে পরীক্ষার সময়সূচী উল্লেখ করা হয়, সেই অংশে বিষয়টি উল্লেখ করে দিতে হবে। পরিবর্তিত এই প্রাত:কালীন পাঠশালার সময়সূচী, প্রয়োজনে বিরতিহীনভাবে সকাল ৭:৩০টা  থেকে দুপুর  ১:৩০টা পর্যন্ত করা যেতে পারে। এই নিয়ম প্রতিবছর স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলবে এবং অন্যান্য উৎসব অনুযায়ী নির্ধারিত ছুটির সাথে সমন্বয় করে নিতে হবে। এরপর গ্রীষ্মকালীন অবকাশ ১ জুন থেকে ১৫ জুন  পর্যন্ত দেয়া প্রয়োজন এই জন্যে, যাতে করে সম্মানিত শিক্ষকগণ শ্রান্তি বিনোদন ভাতা যথাসময়ে পেতে পারে। অথবা গ্রীষ্মের অবকাশ মে মাসের প্রথমার্ধে এনে এরপর মর্নিং স্কুল পরিচালনা করাও যেতে পারে। কারণ যথাসময়ে নির্দ্দিষ্ট পরিমান ছুটির অভাবে, প্রাপ্য শ্রান্তিবিনোদন ভাতা ৩ বছর পূর্ণ হবার ১/২ দিন বাকী থাকার কারণে ও বিভিন্ন জটিলতায় অনেক শিক্ষক নিদ্দির্ষ্ট সময়ের শ্রান্তি বিনোদন ভাতা থেকে বঞ্চিত হয়, অথবা আরো এক বছর পরেও পেয়ে থাকে, যা কাম্য নয়।

যা হোক, পুরো বক্তব্যে একাধিক বিষয় এলেও মূল কথা একটাই। আর সেটি হলো প্রত্যেক বছর গ্রীষ্মের দিনে উল্লেখিত সিস্টেম অনুযায়ী মর্নিং স্কুল বা প্রাত:কালীন পাঠশালার প্রয়োজনীয়তা। সব বিষয়ে সুবিধা অসুবিধা থাকলেও মর্নিং স্কুলে সুবিধাই বেশী। যেমন- শহরে যানজট কমবে, দেশে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে, সর্বোপরি  বৈচিত্রতার সাথে শিখন-শেখানো কার্যক্রম আরো গতিশীল হবে। এখানে প্রয়োজনে মাঠ পর্যায়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মরত কর্মকর্তাদের স্কুল পরিদর্শনের জন্যে, এই সময় সূচীর আওতায় এনে, কার্যক্রমকে আরো  গতিশীল করা যেতে পারে।

লেখকঃ শিক্ষক ও সাহিত্যিক

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ সংবাদ