২৮শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

স্বাধীনতা আন্দোলনের বহ্নিশিখা জ্বালিয়েছিলেন মৃত্যুজয়ী ক্ষুদিরাম

আকাশ ইকবাল

গত ৩ ডিসেম্বর ছিল মৃত্যুজয়ী অগ্নিকিশোর ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম দিন। ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতার মেদিনীপুর শহর সংলগ্ন হাবিবপুর গ্রামের বসু পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। বাবা ত্রৈলোক্যনাথ বসু আর মা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী।
বড় তিন বোন- অপরুপা, সরোজিনী, ননীবালা। এর আগে দুই ভাই পর পর মারা যায়। তাই বাঁধনহারা আনন্দের মধ্যেও আবার নবজাতককে হারানোর আশংকা। সেই বিপদের সম্ভাবনা নির্মূল করার জন্য প্রচলিত সংস্কার অনুযায়ী লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী ছেলের ওপর সমস্ত লৌকিক অধিকার ত্যাগ করে তিন মুঠো খুদের বিনিময়ে বড় মেয়ে অপরুপা দেবীর হাতে নবজাতককের দায়িত্বভার তুলে দিলেন। খুদের বিনিময়ে কেনা হলো বলে, শিশুটির নাম রাখা হলো ক্ষুদিরাম। অপরুপা দেবীর ভাষায়, ‘তিন মুঠো খুদ দিয়ে ক্ষুদিরামকে কিনে ছিলাম আমি। মনে মনে লোভ ছিল ক্ষুদিরামকে একা ভোগ দখল করবো। কখন যে আমার অগোচরে সে দেশের লোকের কাছে বিকিয়ে গেছে জানতেও পারিনি। তিন মুঠো খুদের বিনিময়ে আমি তাকে কিনেছিলাম। দেশের মানুষ তাকে কিনল আঁজলা আঁজলা রক্ত দিয়ে।’
মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবা মাকে হারিয়ে বোনের সংসারে বড় হতে লাগলেন ক্ষুদিরাম। ঠিক এই সময় বিদেশী শাসকের উৎপীড়ন থেকে দেশকে মুক্ত করার দুর্নিবার আকাঙ্খায় সারা দেশ ফুঁসে উঠেছিল। সেই উত্তাপ ক্ষুদিরামকেও ছুঁয়ে যায়। নির্যাতিত মানুষের প্রতি অন্তহীন ভালোবাসাপূর্ণ তাঁর কোমল হৃদয়ে বিপ্লবী চেতনা যুক্ত হয়ে ক্ষুদিরাম মুক্তি সংগ্রামের এক আপোষহীন যোদ্ধায় পরিণত হলেন।
(২)
পরিবারের সবাই ক্ষুদিরামকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতো সব সময়। কারণ, কখন কাকে কি দিয়ে দিবে। হয়তো ক্ষুধার্ত মানুষকে নিজের খাবার দিয়ে নিজেই সারাদিন অনাহারে থাকবে। তাই সকলেই তাকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতো। কিন্তু অসহায় মানুষের বেদনা যাকে কাঁদায় তাকে কি এভাবে আগলে রাখা যায়? স্কুল শিক্ষকের কাছে সে ছিল বরাবরই অপদার্থ। অথচ অসহায় মানুষের বিপদে মুহুর্তে জীবন বাজি রেখে ভয়ডরহীন ভাবে ক্ষুদিরাম ঝাঁপিয়ে পড়তো তাদের বাঁচাতে।
অসহায় দুস্থ মানুষের প্রতি তাঁর অন্তহীন ভালোবাসা ছিল সেটা বুঝা যায় এই ঘটনায়,- শীতের এক সকালে এক ভিক্ষুক সাহায্যের প্রত্যাশায় এলো। গায়ের ছেঁড়া কাপড় তার শীত আটকাতে পারছেনা। ঠান্ডা হাওয়ায় ভিক্ষুকটি ঠকঠক করে কাঁপছে। অথচ তাকে দেবার মত ঘরে কিছুই নেই। সম্ভল আছে শুধু পিতার স্মৃতি জড়ানো একটি শাল। মমতায় কিশোরটি নির্দ্বিধায় তার পিতার শেষ সম্ভলটি ভিক্ষুকের হাতে তুলে দেয়।
আরও একটা ঘটনা বলি। একবার শহরে কলেরা মহামারীতে আঁকাল ধারণ করেছে। তখন কলেরা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে, গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হচ্ছে। পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা, আত্মীয় পরিজনকে ফেলে রেখে অন্য সদস্যরা নিজেদের জীবনের তাগিদে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। খবর পাওয়া মাত্র অকুন্ঠচিত্তে কর্তব্য স্থির করে ফেলল ক্ষুদিরাম। সে যে মানুষকে ভালোবাসে, মানুষের এমন দুঃসময়ে দূরে থাকা কি তার পক্ষে সম্ভব? তাই পরিবার পরিজনের নিষেধ অপেক্ষা করে, সে এসে দাঁড়াল রোগান্ত মানুষের পাশে।
দিনের পর দিন রাতের পর রাত জেগে রোগান্ত মানুষদের সেবা করল। সে সময় কলেরা রোগে মারা যাওয়া মানুষদের দাহ করার জন্য লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। এই কাজেও আগ্রহী ছিল স্কুলের সেই অপদার্থ ছেলেটি।
৩।
রোগে-দারিদ্রতায়-অপুষ্টিতে মানুষ মারা যাচ্ছে। অথচ খাদ্য নেই, শিক্ষা নেই, চিকিৎসা নেই, ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার অপরাধে দেশের মানুষ যেন বেঁচে থাকার অধিকার থেকেও বঞ্চিত। অন্যায়-অভিচারের প্রতিকার চাই। আর তার জন্য দেশকে মুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে রক্ত ঢালতে হবে, জীবন দিতে হবে। শিশু কালেই এই নির্মম সত্য উপলব্ধি করে নিজেকে তার উপযুক্ত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে থাকে সে। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে এই অগ্নিশিশু মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মদান করে ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গেয়ে গেছে-
” একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি,
হাসি হাসি পরব ফাঁসি
দেখবে ভারতবাসী। ”

৪।
১৯০৩ সাল। ক্ষুদিরাম তখন স্কুলের ছাত্র। ক্ষুদিরামের বয়স তখন ১৪ বছর। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের আরেক পুরোধা ব্যক্তিত্ব হেমচন্দ্র তখন প্রায়ই মেদিনীপুর যেতেন। এক দিন সন্ধ্যাবেলা তিনি মেদিনীপুরে কোন এক নির্জন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। অন্ধকারে রাস্তার ধারে বসে থাকা কয়েক জন ছেলের মধ্যে এক কচি ছেলে হঠাৎ দৌঁড়ে এসে তার বাইক আটকে অত্যন্ত সহজ ভাবে বলে বসল তাকে একটা রিভলবার দিতে হবে। হেমচন্দ্র খুব অবাক হলেন। তিনি আরও অবাক হলেন সেই কচি শিশুটির কথা শুনে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেন রিভলবার দিতে হবে? জবাবে উত্তর দিলেন, ভারতের উপর ইংরেজরা যে অত্যাচার করছে তার প্রতিশোধ নিতে সে একটা শাহেব মারবে। হেমচন্দ্র পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন ক্ষুদে বালকটি ছিল ১৪ বছরের ক্ষুদিরাম। দেশ প্রেমের আগুনে এই কিশোর বিপ্লবীর ব্যক্তিগত সব ইচ্ছা আকাঙ্খা এমন ভাবে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল যে, উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত সব টাকা স্বদেশী আন্দোলনের তহবিলে দান করে দিয়েছিলেন।
এক বার তাঁর দিদি ঠিক করেছেন ছন্নছাড়া ভাইটিকে বিয়ে দিয়ে সংসারী করলে হয়তো এই মরণপণ লড়াই থেকে দূরে রাখা যাবে। তাই ভাইয়ের কাছে গিয়ে বিয়ের কথা বললে। ক্ষদিরাম পাল্টা উত্তরে বললেন, ‘দিদি ! বিয়েটা এখক থাকুক ! আগে সাদা পঙ্গপালগুলোকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দি। তার পর তোমার কথা মতো বিয়ে করব।’ বোন জিজ্ঞেস করলেন, ‘পঙ্গপাল আবার কারা?’ উত্তরে ক্ষুদিরাম বললেন, ‘দেশের লোকে খেতে পায় না, ওদিকে ফিরিংগীর দল দেশের সমস্ত চাল নিয়ে জাহাজ বোঝাই করে ম্যানচেষ্টারে কাপড়ের মার দেবার জন্য সমুদ্র পাড়ে চালান দিচ্ছে।
৫।
১৯০৮ সাল। কিংস্ফোর্ডকে হত্যার দায়ে ক্ষুদিরামকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেয়া হলো। ফাঁসির আদেশ শুনেও ক্ষুদিরাম হাসছেন। বিস্মিত হয়ে বিচারক ভাবলেন, ‘কিশোর আসামী হয়তো রায়ের অর্থ বুঝতে পারেনি।’ তাই বিচারক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোর্টের আদেশের তাৎপর্য বুঝতে পেরেছ কিনা?’। হাসিমুখেই ক্ষুদিরাম উত্তর দিলেন, ‘নিশ্চয়’। বিচারক আবার জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কিছু বলতে চাও?’। আদালতের কক্ষে ভিড়ে ঠাসা। আদালতে উপস্থিত থাকা শত শত মানুষকে চমকে দিয়ে ক্ষুদিরাম উত্তর দিলেন, আমার মতো অনেক কিশোর আছে যারা এখনও বোমা বানাতে পারে না। আপনাদের মতো পঙ্গপালগুলোকে বোমা মেরে দেশ ত্যাগ করাতে বাধ্য করতে হবে। তাই আমাকে একটু সময় দিলে বোমা তৈরির কৌশলটা শিখিয়ে দিতে পারতাম।’
পাশে দাঁড়ানো এক পুলিশ সার্জেন্ট অনুচ্চ কন্ঠে বলে উঠলেন, ‘এ তো দেখি সিংহের বাচ্চা!’
ফাঁসি হতে দু-চার মিনিট বাকি। তখন ক্ষুদিরাম নিজেই ফাঁসির রশির সমালোচনা নিয়ে ব্যস্ত। ‘ফাঁসির দঁড়িতে মোম লাগিয়ে আবার আরামদায়ক করার দরকার কি?’
১৯০৮ সালের ১১ই আগস্ট হাসিমুখেই আত্¥হুতি দিলেন ফাঁসির মঞ্চের প্রথম শহীদ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম। যাবার আগে চারণ কবির সেই প্রতুশ্রুতি যেন দিয়ে গেলেন,
” আঠারো মাসের পরে
জনম নেব মাসীর ঘরে;
মা গো
চিনতে যদি না পার মা
দেখবে গলায় ফাঁসি”
স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিমন্ত্রে আত্মহুতি দিয়ে হাজারো প্রাণে স্বাধীনতার আন্দোলনের বহ্নিশিখা জ্বালিয়ে যে প্রতিশ্রুতি রেখে গেলেন ক্ষুদিরাম বসু তার পথ ধরেই এলো ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের শেষ ঘন্টা বাজালো সুভাস বোস, সূর্যসেন, প্রীতিলতার মতো হাজারো বিপ্লবীরা। ফাঁসির মঞ্চের সেই অমাল হাসি দিয়ে মৃত্যুজয়ী ক্ষুদিরাম যেন প্রমাণ করে গেলেন…
‘ আমি বিপ্লবী, আমি সত্যাশ্রয়ী,
তাই আমি মৃত্যুর চেয়েও বড়!’
শুভ জন্মদিন ক্ষুদিরাম বসু।

লেখক: শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ সংবাদ