১৪ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সোলেইমানির অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র যে উপায়ে শনাক্ত করল

গত সপ্তাহে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি কাসেম সোলেইমানি বাগদাদের একটি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের কাছে নিহত হন। কিভাবে তার নিখুঁত অবস্থান শনাক্ত করেছে তা নিয়ে তোলপাড় বিশ্ব।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে কিভাবে মার্কিন বাহিনীকে সোলেইমানিকে শনাক্ত করেছে তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সোলেইমানি বাগদাদ থেকে ইরানে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তিনি সিরিয়ার দামেস্কো বিমানবন্দর থেকে বাগদাদে আসেন। সেখান থেকে তার ইরানে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সোলেইমানি কালো গ্লাসে ঢাকা গাড়িতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ডসের চার সদস্যসহ দামেস্কো বিমানবন্দরে আসেন। ওই বিমানেই তাদের বাগদাদে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। বিমানটি ছিল চাম উইংস এয়ারলাইনস। ওই এয়ারলাইনসের এক কর্মী রয়টার্সকে বলেন, বিমানের যাত্রীদের তালিকায় সোলেইমানি কিংবা বিপ্লবী গার্ডসের কোনো সদস্যের কেউ ছিলেন না। এর কিছুদিন আগেই বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনায় ইরানকে চরম মূল্য ভোগের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকায় নিজের ব্যক্তিগত বিমান ব্যবহার এড়িয়ে যান সোলেইমানি।

সোলেইমানির বাগদাদে আগমনের খবর বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে থেকেই কেউ ফাঁস করে। ইরাকের একটি তদন্ত দল এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে।
ইরাকের দুজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ৩ জানুয়ারি মার্কিন হামলার কয়েক মিনিট পরেই ইরাকি তদন্ত শুরু হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা বিমানবন্দরটি ঘেরাও করে রেখেছে। এ ছাড়া পুলিশ, পাসপোর্ট ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাসহ কয়েক ডজন নিরাপত্তাকর্মীকে সেখান থেকে যেতে দেয়া হয়নি। ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকারী ফালিহ আল-ফাইয়াদের নেতৃত্বে এই তদন্ত চলছে। এ ছাড়া শিয়া মিলিশিয়াদের সঙ্গে সমন্বয়ক পিএমএফেরও প্রধান তিনি।
সন্দেহভাজনদের মধ্যে বাগদাদ বিমানবন্দরের দুই নিরাপত্তাকর্মী ও চাম উইংসের দুই কর্মী রয়েছেন। সূত্র জানিয়েছে, দামেস্কো বিমানবন্দরে এক গুপ্তচর ও বিমানেই অবস্থান করে কাজ করছিল।

জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার তদন্তকারীরা বিশ্বাস করেন, গুপ্তচরদের একটি বড় গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে কাজ করেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে তথ্য ফাঁস করা চার সন্দেহভাজন। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের কাউকেই গ্রেফতার করা হয়নি। চাম উইংসের ওই দুই কর্মীর বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে সিরীয় গোয়েন্দা বাহিনী। দুই ইরাকি নিরাপত্তাকর্মী এমন তথ্য দিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিরীয় গোয়েন্দা পরিদফতরের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। বাগদাদ বিমানবন্দরের দুই নিরাপত্তাকর্মীর বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছেন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার গোয়েন্দারা। এসব গুপ্তচর দেশটির স্থাপনা নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এক কর্মকর্তা বলেন, বাগদাদ তদন্ত দলের প্রাথমিক তদন্তে এটিই বলছে যে, সোলাইমানিকে হত্যার প্রথম আভাসটি আসে দামেস্কো বিমানবন্দর থেকে। গুপ্তচরদের বাগদাদ বিমানবন্দর সেলের কাজ ছিল, তার আগমন ও গাড়িবহর নিয়ে বিস্তারিত তথ্য মার্কিন বাহিনীকে দেয়া।

অভিযোগ রয়েছে, সিরিয়া ও ইরাকের বেশ কয়েকজন সাংবাদিক সোলেইমানির অবস্থান ফাঁস করতে সাহায্য করেছেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, হামলার বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান শনাক্ত করে আসছে। কীভাবে এমন নির্ভুলভাবে হামলা সম্ভব হলো, তা জানতে চাইলে বলতে অস্বীকার করেছেন তিনি। দামেস্কোর চাম উইংসের ব্যবস্থাপক বলছেন, তদন্ত বা হামলা নিয়ে কর্মীদের কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তা ক্যামরার ফুটেজের বরাতে বিমানবন্দরের দুই কর্মকর্তা বলেন, গত ৩ জানুয়ারি রাত ১২টা ৩০ মিনিটে বাগদাদ বিমানবন্দরে অবতরণ করে সোলাইমানির বিমান। বিমান থেকে বেরিয়ে কাস্টমসে না গিয়ে টারমাকের সিঁড়িতে ওঠেন তারা। বিমানের বাইরে মুহান্দির তার সঙ্গে দেখা করেন। পরে অপেক্ষারত সাঁজোয়া যানের দিকে তারা পা বাড়ান। আরেকটি সাঁজোয়া এসইউভিতে ওঠা সোলাইমানিকে পাহারা দিচ্ছিলেন সেনারা।

কর্মকর্তারা বলেন, বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে মূল সড়কের দিকে ধাবিত হয় তাদের গাড়িবহর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দুটি রকেট গিয়ে আঘাত হানে সোলাইমানি ও মুহান্দিসকে বহন করা গাড়িতে। তখন রাত ১২টা ৫৫ মিনিট। পরে তাদের নিরাপত্তা সদস্যদের বহনকারী এসইউভিতে গিয়ে আঘাত হানে দ্বিতীয় মার্কিন রকেট। হামলার কয়েক ঘণ্টা পর বিমানবন্দরের রাতের শিফটের কর্মীদের কাছে আসা মেসেজ ও ফোনকল তদন্তে মনোযোগ দেন তদন্তকারীরা। সোলেইমানির আগমনের খবর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কে ফাঁস করেছেন, তা বের করতেই এই তদন্ত করা হয়। বিমানবন্দর নিরাপত্তা ও চাম উইংসের কর্মীদের কয়েক ঘণ্টা ধরে জেরা করেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, তাকে ছেড়ে দেয়ার আগে অন্তত ১২ ঘণ্টা একনাগারে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সোলেইমানি আসার আগে তিনি কাদের সঙ্গে কথা বলেছেন কিংবা বার্তা পাঠিয়েছেন, প্রথম চার ঘণ্টা তাকে সেই প্রশ্ন করা হয়েছে। তার মোবাইল ফোন জব্দ করে নিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ সংবাদ