তীব্র গরমে জনজীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ দুর্ভোগ। মানুষ ঠিকমতো ঘরের বাইরেই বের হতে পারছেন না। যাদের জীবিকার তাগিদে ঘরের বাইরে যেতে হচ্ছে তাদের অবস্থাও বেশ শোচনীয়। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষেরা। যেখানে সাধারণ মানুষেরই নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে সেখানে খেটে খাওয়া মানুষের অবস্থা কতটা ভয়াবহ ভাবা যায়?
কাঠফাটা গরমে প্রাণ যায় যায় অবস্থা শ্রমজীবী মানুষের। বুধবার (১৯ এপ্রিল) দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় এমন চিত্র। যেখানে এক জায়গায় ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকা যায় না, সেখানে তাদের চালাতে হচ্ছে রিকশা-ভ্যান। কাউকে দেখা যাচ্ছে পাঠাও ফুডে খাবার ডেলিভারি দিতে।
পথচারীদের মাঝে কেউ কেউ বের হয়েছেন ছাতা নিয়ে। শ্রমজীবী ও কর্মজীবীদের জীবন যেন বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। তারপরও জীবন-জীবিকার তাগিদে ঘাম ঝরিয়ে ছুটছেন তারা।
তবে টানা বেশ কদিন পর অসহনীয় তাপমাত্রা না কমলেও গরমের অনুভূতিটা কিছুটা কমেছে আজ। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, তাপমাত্রা আগের মতো থাকলেও বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাঠফাটা রোদে কীভাবে কাজ করছেন সাধারণ মানুষ তা জানতে কথা হয় মিরপুর-১ নম্বর এলাকার ভ্যানচালক শফিক গাজীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তীব্র রোদের কারণে ভ্যান চালাতে কষ্ট হচ্ছে। এত গরম যে রাস্তায় দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। গরমের কারণে মানুষ কম বের হচ্ছে। ফলে আয়-ইনকাম কমে গেছে।’
কথা হয় ফুটপাতে ফুল বিক্রি করা আরেক দিনমজুর আজাদ লতিফের সঙ্গে। তিনি সময় সংবাদকে বলেন, ‘বিছানায় শুইতে গেলেও গরম লাগে। ঘরে যে একটা ফ্যান আছে তা দিয়াও কুলায় না। এমন গরম আমার বাপের জন্মেও দেখি নাই। মন চায় ফুল বিক্রি বাদ দিয়া গাছের তলায় শুইয়া থাকি। কিন্তু সেই সুযোগ নাই। খামু কী?’
গরমে কাজ করতে কষ্ট হয় কি না জানতে চাইলে কাওরানবাজার এলাকার রিকশাচালক লিটন মিয়া বলেন, ‘কি কমু ভাই! যেই গরম পড়ছে। চান্দি ফাইটা যাইতাছে। হাত পা জ্বালা পোড়া করে। বহুত কষ্ট হয় রিকশা চালাইতে। দম লেগে আসে। মাথা ঘুরায়। তাও পেটের দায়ে কাম করি। কাম না করলে খামু কি? পেট চলবো কেমনে? গরমে কষ্ট তো শুধু আমগো মতো খেটে খাওয়া গরিব মাইনষের!’
কারওয়ানবাজারে কথা হয় আরেক রিকশাচালক সালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গরম কেমন পড়ছে, তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। এটা তো ধনি-গরিবের জন্য আলাদা হয় না। তারপরও যাদের গাড়ি আছে, তারা এসির মধ্যে শান্তিতে থাকতে পারে, বাড়ি ও অফিসে ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে বসে থাকতে পারে। আর আমাদের মতো গরিবের এই গরমের মধ্যেই কষ্ট করে ভাত জোগাতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, গরমে শুধু যে কষ্ট হচ্ছে তা নয়, আয়-রোজগারও কমেছে। একদিকে গরমের কারণে বেশিক্ষণ রিকশা যেমন চালানো যায় না, আরেকদিকে যাত্রীও তেমন পাওয়া যায় না। মানুষ গরম ও রোজার কারণে দিনে বাসা থেকে তেমন বের হয় না।
একই কথা বলেন রাইড শেয়ারিংয়ে যাত্রী বহনকারী মোটরসাইকেলের চালক সালাম। তিনি বলেন, এই রোদে মোটরসাইকেল চালাতে কষ্ট হয়। তার ওপর দীর্ঘক্ষণ জ্যামে বসে থাকতে হয়। কিন্তু জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই বের হতে হয়। এতেও তেমন লাভ হচ্ছে না। রোদ আর গরমের কারণে এখন মানুষ মোটরসাইকেলে যেতে চায় না। কষ্ট করে হলেও বাস বা রিকশায় যায়। কারণ বাস ও রিকশায় অন্তত মাথার ওপর ছায়া দেয়ার মতো কিছু আছে, মোটরসাইকেলে গেলে তো রোদে পুড়তে হয়।’
তবে এই ভয়ংকর গরমেও কষ্ট পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন রাজধানীর খামারবাড়ি এলাকার রিকশাচালক মোহাম্মদ নাসিম। তার বয়স ৭০ ছুঁই ছুঁই। তার কাছে গরমে কেমন কষ্ট হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রোজা রেখে রিকশা চালাই তাই তেমন একটা কষ্ট হয় না। আল্লাহ চালায়ে নিয়া যান। উনি রহমত করেন। উল্টো রোজা না রাখলেই কষ্ট বেশি হয়।’
এ সময় বাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের মুজাহিদ মুস্তাহাবের সঙ্গে কথা হয় গরম নিয়ে। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এবার ঢাকায় অনেক বেশি গরম পড়েছে। এতে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ছাড়াও সবাইকেই কষ্ট করতে হচ্ছে। আমার নিজেরই ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে গরমে শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। এক জায়গায় দাঁড়িয়েও থাকা যায় না। মনে হয় মাথা ঘুরে পড়ে যাব। আমারই যদি এ অবস্থা হয় তাহলে যারা রোদের মধ্যেই কাজ করেন সারাক্ষণ তাদের কী অবস্থা।’
একই লাইনে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী জাহিদুর রহমান বলেন, ‘বাইরে তো গরমের জন্য এক ঘণ্টাও থাকা যায় না। বাসায়ও গরমে নাজেহাল অবস্থা। মাথার ওপর ফ্যান ঘোরে, কিন্তু সেই বাতাসও গরম। দিনের বেলা ট্যাপ থেকে যেন ফুটন্ত পানি বের হয়। একটু বৃষ্টি যে কবে নামবে সেই অপেক্ষায় আছি।’
এপ্রিলে তাপপ্রবাহ স্বাভাবিক ঘটনা হলেও এবারের তাপমাত্রা বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। রোদের প্রখরতাও অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি। ইতোমধ্যে দুটি রেকর্ড ভেঙেছে তাপমাত্রা। ৫৮ বছরের মধ্যে ঢাকার তাপমাত্রা এখন সর্বোচ্চ। আর ৯ বছরের মধ্যে চুয়াডাঙ্গায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, তিন কারণে এবারের তাপপ্রবাহের মাত্রা অন্যান্য বছরের চেয়ে বেশি। সেগুলো হলো- জলীয়বাষ্প অস্বাভাবিক থাকা, দক্ষিণ-পূর্ব মৌসুমি বায়ু কম আসা এবং সাগরে কোনো ঘূর্ণিঝড়ের প্রক্রিয়া তৈরি না হওয়া।
আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম সময় সংবাদকে বলেন, সাগর থেকে যে বাতাস আসে, তা হলো দক্ষিণ পূর্ব মৌসুমী বায়ু। তা আসার সময় জলীয়বাষ্প নিয়ে আসে। কিন্তু এবার বাতাসটা আসছে না সেভাবে। আর জলীয়বাষ্পও খুব কম। এ ছাড়া পশ্চিমা মৌসুমি বায়ুও শুকনো। এর সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বায়ু যেখানে মিশে যায়, সেখানে কালবৈশাখীর সৃষ্টি হয়। তা এখনো হচ্ছে না। কারণ জলীয়বাষ্প কম। ফলে দেশে শুকনো বায়ু প্রবেশ করছে ও তাপমাত্রা বাড়ছে।
তবে আগামী কয়েকদিনে মধ্যে বৃষ্টিপাতের দেখা মিলতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ শাহীনুল। তিনি বলেন, আগামী ২৪ এপ্রিলের দিকে সারা দেশে কালবৈশাখী ঝড় হতে পারে।
























