১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সবচেয়ে বেশি শিরোপা জিতেছেন যেসব আর্জেন্টাইন ফুটবলার

যুগে যুগে আর্জেন্টিনায় জন্ম নিয়েছে দারুণ সব ফুটবল প্রতিভা। এমনকি সর্বকালের সেরা হিসেবে যাদের ধরা হয় এমন দুজন ফুটবলার লিওনেল মেসি ও দিয়েগো ম্যারাডোনাও আর্জেন্টাইন। জাতীয় দল কী ক্লাব, আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের সাফল্য কম নয়। সবচেয়ে বেশি ট্রফি জয়ের কৃতিত্বও এক আর্জেন্টাইনের দখলেই।

একজন ফুটবলার খেলোয়াড় হিসেবে কতটা সফল তার অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয় শিরোপাকে। দলকে শিরোপা এনে দিতে পারলে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের দাম বেড়ে যায় আরও। লিওনেল মেসি কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোদের সারাবিশ্বের ফুটবলভক্তদের কাছে যে গ্রহণযোগ্যতা তার অন্যতম কারণ তাদের দলের সফলতা। আর্জেন্টিনার তো বটেই বিশ্বের যে কোনো ফুটবলারের ঈর্ষা জাগতে পারে লিওনেল মেসির জেতা ট্রফির তালিকা দেখলে। সম্ভাব্য সকল শিরোপাই জিতেছেন তিনি। কী ক্লাব, কী জাতীয় দল – কোথাও কিছু জিততে বাকি রাখেননি মেসি।

তবে শুধু মেসি নয়, ট্রফির সংখ্যায় সাফল্যের আকাশ ছোঁয়া ফুটবলার আরও অনেকেই আছেন যারা আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে চাপিয়েছেন। সে তালিকায় একটু চোখ রাখা যাক-

 

আলফ্রেডো ডি স্টেফানো: ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারদেরই একজন ‘দ্য গোল্ডেন অ্যারো’ খ্যাত ডি স্টেফানো। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার রিভারপ্লেটের হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছান রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলে। ১৯৫৬ সালে ইউরোপিয়ান কাপের (অধুনা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) প্রথম আসরেই রিয়াল মাদ্রিদকে চ্যাম্পিয়ন করতে বড় অবদান রাখেন। রিয়ালের জার্সিতে ৩৯৬ ম্যাচ খেলে ৩০৮ গোল করেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসের চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলের মালিক তিনিই।

 

রিয়ালের জার্সিতে আটবার লা লিগা ও পাঁচবার ইউরোপিয়ান কাপ ছাড়াও জিতেছেন আরও বেশকিছু শিরোপা। উয়েফার আয়োজিত টুর্নামেন্টে তার চেয়ে বেশি শিরোপা নেই আর কোনো আর্জেন্টাইনের। ক্যারিয়ারে মোট ২৫টি শিরোপা জেতা ডি স্টেফানো আর্জেন্টিনা ছাড়াও স্পেন ও কলম্বিয়ার জার্সিতে খেললেও কখনোই বিশ্বকাপে মাঠে নামতে পারেননি।

হাভিয়ের মাশচেরানো: তার সেরা সময়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হলেও সেভাবে পরিচিতি পাননি মাশচেরানো। এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার নেতৃত্ব দিয়েছেন জাতীয় দলকেও। আর্জেন্টিনাকে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতে রেখেছিলেন দারুণ অবদান। ক্লাব পর্যায়ে খেলেছেন লিভারপুল ও বার্সেলোনার মতো বিশ্বসেরা দলে। শিরোপাও জিতেছেন মুড়িমুড়কির মতো। সর্বোচ্চ শিরোপাজয়ী আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের মধ্যে একজন তিনি।

বার্সেলোনার হয়ে পাঁচবার লিগ শিরোপা জেতা মাশচেরানো দুইবার জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুবার জিতেছেন অলিম্পিক মেডেল। ক্যারিয়ারে সব মিলিয়ে ২৫টি শিরোপা জিতেছেন তিনিও।

লুচো গঞ্জালেস: ডি স্টেফানো বা মাশচেরানোর মতো পরিচিতি নেই লুচো গঞ্জালেসের। তবে শিরোপা জেতার ক্ষেত্রে তাদের দুজনকে টেক্কা দিয়েছেন আর্জেন্টিনার হয়ে ৪৫ ম্যাচ খেলা এই মিডফিল্ডার। হুরাকেন, রিভারপ্লেট, পোর্তো ও মার্শেইয়ের মতো ক্লাবে খেললেও লুচো বেশি পরিচিত পোর্তোর হয়ে তার সাফল্যের জন্য। পর্তুগিজ ক্লাবটির হয়ে দুই স্পেলে খেলে ছয়টি লিগ শিরোপা জেতেন। এছাড়া মার্শেইয়ের হয়ে তিনবার ও মার্শেইয়ের হয়ে একবার জেতেন লিগ শিরোপা। আর্জেন্টিনা অলিম্পিক দলের হয়ে ২০০৪ এথেন্স অলিম্পিকে স্বর্ণও জিতেছেন তিনি। ক্যারিয়ারে সবসুদ্ধ ২৯টি শিরোপা জিতেছেন লুচো।

কার্লোস তেভেজ: সেরা সময়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড হিসেবে খ্যাতি ছিল কার্লোস তেভেজের। বোকা জুনিয়র্সের হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও ব্রাজিলিয়ান ক্লাব করিন্থিয়াসের হয়ে পান সাফল্যের দেখা। এরপর ওয়েস্টহ্যামের হয়ে শুরু করেন ইউরোপিয়ান ফুটবলযাত্রা। এরপর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও ওয়েইন রুনির সঙ্গে বিধ্বংসী জুটি গড়ে দুবার লিগ শিরোপা জেতেন। জেতেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপাও। এরপর বিতর্কিত চুক্তিতে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়ে ক্লাবটিকে ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা ক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ভূমিকা রাখেন। সেখানেই একবার জেতেন লিগ শিরোপা। এরপর সিরি আ’য় য়্যুভেন্তাসে যোগ দিয়ে আরও দুবার জিতেছেন লিগ শিরোপা। এরপর ক্যারিয়ারের শেষবেলায় ফিরেছিলেন বোকায়। সব মিলিয়ে ২৯টি শিরোপা জিতেছেন তেভেজও।

 

অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া: অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়াকে বলা হয়ে থাকে বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপজয়ী ডি মারিয়ারও ক্যারিয়ারে মোটামুটি কোন শিরোপাই জেতা বাকি নেই। বিশ্বকাপ ছাড়াও জিতেছেন কোপা আমেরিকা ও অলিম্পিকের শিরোপা। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০০৭ সালে যুব বিশ্বকাপও জিতেছিলেন তিনি। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ, কোপা ও অলিম্পিকের ফাইনালে গোলের রেকর্ড আছে ডি মারিয়ার।

ক্লাবের হয়েও উজ্জ্বল তার ক্যারিয়ার। রিয়ালের হয়ে একবার করে জিতেছেন লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার পথে ফাইনালে হয়েছিলেন সেরা খেলোয়াড়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে এক মৌসুম ব্যর্থতায় কাটানোর পর পিএসজিতে যোগ দেন তিনি। লিগ ওয়ানের ক্লাবটির হয়ে ২০২১-২২ মৌসুম পর্যন্ত খেলে পাঁচবার জিতেছেন লিগ শিরোপা। ক্লাবটির হয়ে জিতেছেন আরও ১৪তি শিরোপা। এছাড়া পর্তুগিজ লিগের দল বেনফিকার জার্সিতেও একবার লিগ জিতেছেন তিনি। ক্যারিয়ারে মোট ৩৩টি শিরোপা নিয়ে আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের মধ্যে দ্বিতীয় সফলতম তিনিই।

 

লিওনেল মেসি: তর্কযোগ্যভাবে ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় মেসিই। তাই আশ্চর্য হবার কোনো কারণই নেই যে সবচেয়ে বেশি শিরোপা জেতা ফুটবলারের নামটা তারই হবে। ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটাই কাটিয়ে দিয়েছেন বার্সেলোনায়। এরপর পিএসজিতে এক মৌসুম খেলে আগামী মৌসুমে যোগ দিচ্ছেন ইন্টার মিয়ামিতে। ক্লাব ক্যারিয়ারে সম্ভাব্য সকল শিরোপা জেতা মেসির ক্যারিয়ারের অপূর্ণতা বলতে ছিল জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা না থাকাটা। তবে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের পরের বছরেই কাতারে পরম আকাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ শিরোপাটাও উঁচিয়ে ধরেছেন অধিনায়ক হিসেবে। সেরা খেলোয়াড় হিসেবে জিতেছেন গোল্ডেন বলও।

আর্জেন্টিনার হয়ে যুব পর্যায়েও বিশ্বকাপ জিতেছেন মেসি, সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে জিতেছেন গোল্ডেন বল ও বুট। এছাড়া জিতেছেন অলিম্পিক শিরোপাও।

ক্লাব পর্যায়ে বার্সেলোনার হয়ে দুবার জিতেছেন ট্রেবল। ক্লাবটির হয়ে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল নিয়ে লা লিগার ইতিহাসেরই সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। সব মিলিয়ে ক্লাব ক্যারিয়ারে তার গোলের সংখ্যা ৭১০টি।

বার্সেলোনার জার্সিতে ১০বার লা লিগা ও চারবার জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। তিনবার জিতেছেন ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা। তিনবার উয়েফা সুপার কাপ, সাতবার স্প্যানিশ কাপ ও আটবার স্প্যানিশ সুপার কাপ জিতেছেন বার্সেলোনার জার্সি গায়ে। এছাড়া পিএসজিতে যোগ দিয়ে দুবার লিগ শিরোপা ছাড়াও একবার জিতেছেন ফ্রেঞ্চ সুপার কাপ।

ক্যারিয়ারে সব মিলিয়ে ৪৩টি শিরোপা জিতেছেন মেসি। যা তাকে ব্রাজিলিয়ান কিংবিদন্তি দানি আলভেসের পাশে বসিয়েছে। যৌথভাবে তারা ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি শিরোপা জেতা ফুটবলার।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ সংবাদ