২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মিরসরাইয়ে মৌচাষী খাবিরের সাফল্যের গল্প

ইলিয়াছ রিপন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি :

আপন কর্ম প্রচেষ্টা এবং কর্মদ্যোমের মাধ্যমে মৌচাষে স্বাবলম্বী হওয়ার উজ্জ্বল দষ্টান্ত স্থাপন করেছেন খাবির ইবনে আমিন চৌধুরী নামের এক যুবক। মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ থানার দেওয়ানপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারে মৃত আমিনুর রহমান প্রকাশ লালু মিয়া চৌধুরীর ঘরে জন্ম নেয়া এই যুবক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাষ্টার্স করার পর কিছুদিন চাকুরী করেন চট্টগ্রাম ইপিজেডে প্যারাগন সু লেদার কোম্পানীতে। কিন্তু পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ না হয়ে চাকুরী ছেড়ে নিজ উদ্যোগে বাড়ির আঙ্গিনায় প্রতিষ্ঠা করেন আসা মৌচাষ প্রকল্প (প্রাঃ)।

বর্তমানে এই প্রকল্পে মোট মৌ-কলোনীর সংখ্যা ৯০টি। এই প্রকল্পের পরিধি জয়পুর থেকে ওয়াহেদপুর পর্যন্ত একটি কলোনী থেকে সপ্তাহে বসন্ত (এপ্রিল-১৭ জুন) ঋতুতে মধু আহরিত হয় ১ কিলো ৭৫০ গ্রাম। আর অন্যান্য ঋতুতে ১ কিলোগ্রাম শুধুমাত্র যে মৌবাক্সে ১লক্ষ ২০হাজার মৌমাছি থাকে। ভরা মৌসুমে এই প্রকল্প থেকে মাসে মধু আহরিত হয় তিন মণ। অন্যান্য মাসে আড়াই মণ মধু উৎপাদন হয়। এই আহরিত মধু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিদেশে বিক্রি করা হয়। ১ কিলো মধু ১২শ টাকা বিক্রি করা হয়। খাবির প্রতি মাসে মধু বিক্রি করে আয় করেন প্রায় ৩০-৩৫ হাজার টাকা।

মৌমাছি প্রতিপালনে কিভাবে উদ্বুদ্ধ হলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মাষ্টার্স শেষ করার পর কিছুদিন চাকুরী করেছিলাম। পরে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে এসে অত্যন্ত শখের বশে কবুতর পালন করি। ঐ সময় ১৩৭ জোড়া কবুতর ছিল। আর এই কবুতর থাকার জন্য একটি বড় বাক্স ছিল। একদিন হঠাৎ দেখলাম ঐ কবুতরের বাক্সে কয়েক হাজার মৌমাছি। সিদ্ধান্ত নিলাম মৌমাছি প্রতিপালন করার মাধ্যমে মধু উৎপাদন করব। আমার এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছেলে নাকি করবে মৌচাষ! পরে অবশ্য মা সব মেনে নেন। আমার মৌচাষে অভিজ্ঞতা না থাকায় বিসিক থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহন করি। পরে ভারতের ব্যাঙ্গালোরে দ্বিতীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৯৯৫ সালের নভেম্বর মাসে নিজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করি আসা মৌচাষ প্রকল্প (প্রাঃ)। ’

খাবির চৌধুরী বেকার যুবকসহ মৌচাষে আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করছেন। এ পর্যন্ত রাজশাহী, পাবর্ত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৩৫০জন প্রশিক্ষাণার্থী প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন বলে তিনি জানান। একজন প্রশিক্ষাণার্থী ৭ হাজার টাকা দিয়ে এক সপ্তাহ বা ১ মাস অথবা ৩ মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ নিতে পারবে। মিরসরাইয়ের উল্লেখযোগ্য ১৪ মৌচাষীর মধ্যে খাবির চৌধুরীর মৌ কলোনীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ মৌচাষ সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি আরো বলেন, যে কেউ বাউন্ডারিযুক্ত বাড়ির আঙ্গিনায় স্বল্প খরচে মৌচাষ করতে পারবেন। একটি আদর্শ মৌবাক্স (বাচ্চা ঘর ও মধু ঘর) এই দুই বাক্স মিলে চৌদ্দটি ফ্রেমের সমন্বয়ে সৃজনী কাঁঠাল কাঠ ব্যবহার করে পরিপূর্ণ একটি মৌ কলোনী তৈরিতে খরচ পড়বে ৭ হাজার ৮শ’ টাকা। একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি ১৫ হাজার টাকা খরচ করে একটি কলোনীতে সপ্তাহে মাত্র ৩০ মিনিট সময় দিয়ে মাসে ৫-৬ হাজার টাকা আয় করতে পারবে। যারা শিক্ষিত হয়েও কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার জীবন পার করছেন তারা কম খরচে মৌচাষ করে মধু ও মোম উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারেন। এর প্রকৃত উদাহরণ তো খাবির ইবনে আমিন চৌধুরী।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ সংবাদ