বিশ্বজুড়ে এটা স্বীকৃত যে বিশ্বে বর্তমানে একমাত্র পরাশক্তি আমেরিকা। গোটা পৃথিবী তার প্রযুক্তির নাগালে। সেই সাত সমুদ্র তের নদীর পার থেকে ছুটে এসে কয়েকটা রণতরীর উপর ভর করে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার এবং ইরাকে সাদ্দাম সরকারের পতন ঘটিয়ে দিল। জর্জ ডাব্লিউ বুশের আমলে আমেরিকাকে যুদ্ধবাজ দেশ হিসেবে বদনাম সইতে হয়েছে। ওবামার আমল পর্যন্তও এই ধারণা ছিল যে আমেরিকা অজেয়, কেউ তাদের ঘাটাতে সাহস পাবে না।
কিন্তু বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা কি একটু নতজানু হয়ে গেছে? এই প্রশ্ন এখন গোটা বিশ্বজুড়ে। প্রথমত রাশিয়ার পুতিনের সঙ্গে ভাব জমানোর জন্য অনেক নমনীয় সুরে কথা বলছেন। অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একের পর এক সামরিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে ঘোষণা দিচ্ছে, ‘বাবা আমেরিকা! এখন তোমার গোটা সীমানা আমার ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার নিচে!’ এসব উসকানি শুনেও ট্রাম্প চুপচাপ। উল্টো বলে চলেছেন, উত্তর কোরীয় নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারলে তিনি গর্ব অনুভব করবেন।
একারণে প্রশ্ন উঠেছে, চারদিকে এত বিরোধিতা এবং সমালোচনার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন কি আসলে একটু ভয় পেয়েছে? কারণ যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দিকে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে বেশ গরম দেখালেও এখন সাংঘাতিক রকমের নরম। দেশটির বেপরোয়া পরমাণু কর্মসূচি ঠেকাতে আমেরিকা যে ঠিক কী চাইছে, তা স্পষ্ট হচ্ছে না কিছুতেই। কিম জং উনকে গোড়া থেকেই ‘শিক্ষা’ দিতে চাইছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু কী ভাবে! ট্রাম্পের ‘কাছের লোক’ রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলছেন যুদ্ধের কথা। প্রয়োজনে কোমর বাঁধার হুমকি দিয়েছেন জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালিও। পররাষ্ট্র মন্ত্রী রেক্স টিলারসনের কথায় আবার এরই মধ্যে অন্য সুর। বেশ খানিকটা মোলায়েমও।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা উত্তর কোরিয়ার শত্রু নই। তাই এখনই সেখানে ক্ষমতা বদলের কথা ভাবছে না আমেরিকা। একটা অজুহাত খাড়া করে সেনা পাঠানোরও কোনো পরিকল্পনা নেই আমাদের।’ সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে টিলারসন এমনকি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনারও ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে শর্ত একটাই-অস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করতে হবে উত্তর কোরিয়াকে। যা নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়নি কিমের দেশ। বরং সম্প্রতি নয়া ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পরে পিয়ংইয়ং জানিয়েছে, সামনে আরো আসছে।
যার জবাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে তড়িঘড়ি যৌথ মহড়ায় নামতে দেখা যায় মার্কিন সেনাদের। কিমকে ঠেকাতে চেয়ে ট্রাম্প একহাত নেন চীনকেও। ক্রমশ চড়তে থাকে পারদ। সিনেটর গ্রাহাম তো বলেই দেন, ‘যুদ্ধ হলে ওখানেই (কোরীয় উপসাগর) হবে। হাজারটা মানুষ মরলেও ওখানেই মরবে। এখানে নয়। প্রেসিডেন্ট নিজে আমাকে বলেছেন, যুদ্ধ ছাড়া গতি নেই।’ অথচ এর ঠিক তিন দিনের মাথায় যুদ্ধের সম্ভাবনা কার্যত উড়িয়েই দিলেন তিনি। জানা গেছে, খুব শিগগির তিনি এশিয়া সফরে কিম জং উনের মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকও করবেন!
কেন হঠাৎ এই ভোলবদল? উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই বলছেন, কিমের ওই ‘নাগালেই আমেরিকা’ হুমকিটাই কাঁপিয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনকে। কেউ আবার বলছেন, এটাও একটা কূটনৈতিক চাল। টিলারসনকে দিয়ে শান্তির পক্ষে প্রচার চালিয়ে ফাঁকতালে উত্তর কোরিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইছে আমেরিকা। কিমের দেশ যাতে বাধ্য হয় মতবদলে। শান্তিপূর্ণভাবে কিমকে চাপের মধ্যে রাখাটাই যে কৌশল, তার একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন টিলারসনও। দিন কয়েক আগেই ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, উত্তর কোরিয়া প্রসঙ্গে চীনের ভূমিকায় তিনি হতাশ। টিলারসন যদিও পুরো দোষটাই বেইজিংয়ের ঘাড়ে চাপাতে নারাজ। তিনি বলেছেন ‘বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী শুধু উত্তর কোরিয়াই। তবে চীনের সঙ্গে ওদের সম্পর্কটা যেহেতু ভাল, তাই উত্তর কোরিয়াকে এক মাত্র বেইজিংই ঠেকাতে পারে।’
তা হলে কি কিমকে বাগে আনতে আলোচনাই একমাত্র পথ? ধোঁয়াশা জিইয়ে রেখেই হোয়াইট হাউসের সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মিডিয়া সচিব সারাহ স্যান্ডার্স বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসন ঠেকানো, ওদের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা। তাই আমরা সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখছি। কী সেই পদক্ষেপ, এখনই তা বলা সম্ভব নয়।’
পোস্টটি যতজন পড়েছেন : ২৭৬























