১১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিশ্ব ইজতেমা: দিল্লি হয়ে ঢাকা

‘পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। এটা নতুন কোনো কথা নয়। পৃথিবীর মোহ আমাদের আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে আনে। আল্লাহর পথে পরিশ্রমের কথা ভুলিয়ে দেয়’—নামাজ শেষে বয়ান করছিলেন একজন ইসলামি চিন্তাবিদ। উর্দুতে বয়ান হচ্ছিল, সেই বয়ানের বাংলা সারমর্ম বলছিলেন তার পাশে অপর এক আলেম। বয়ান চলছিল, ‘ধর্মের দাওয়াত দিতে গিয়ে আমরা যেন কারো সঙ্গে আচরণ খারাপ না করি, বিধর্মীরা যেন কষ্ট না পায়, সাধারণ মুসলমানদের সঙ্গেও আচরণ ভালো করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কারো হক যেন নষ্ট না হয়।’ একজন স্বেচ্ছাসেবীকে জিগ্যেস করলাম—কে বয়ান করছেন? উত্তরে বললেন, ‘কে বলছেন সেটা জরুরি না। কী বলছেন—সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। নাম বলবার নিয়ম নেই।’

দেশবিদেশে লাখো মানুষের জমায়েতে মুখরিত তুরাগের প্রান্তর। চলছে তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার এ বছরের প্রথম পর্ব। নামাজের পরে অনেকেই দুপুরের খাবারের তোড়জোড় শুরু করলেও তখনো বয়ান মিনারকে ঘিরে হাজার হাজার মুসল্লি। ধর্মের ব্যাখ্যা শুনছেন গভীর মনোযোগে।

বয়ানের কিছুই বুঝতে পারছিলেন না সৌদি আরবের মুহাম্মদ নায়েফ। তিনি এসেছেন রিয়াদ থেকে। কিন্তু তার ভালো লাগছিল এই বিশাল সমাবেশের সান্নিধ্য। খুব অবাক হলেন জেনে যে, ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমা হচ্ছে। হজের দেশ সৌদি আরবে এর চেয়ে বেশি মানুষের জমায়েত তিনি দেখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতেমায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় তাবলিগ জামায়াতের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় যে শৃঙ্খলা তা দেখে মুগ্ধ নায়েফ। তিনি বললেন, ধর্মের জন্য মানুষের এই সম্মিলন তাকে খুব আকৃষ্ট করেছে। স্বেচ্ছাসেবীদের দ্বারা এই যে কয়েক মাইল লম্বা সামিয়ানা তৈরি হয়েছে এটা জেনেও তিনি খুব বিস্মিত হলেন।

‘তাবলিগ’ অনুসারীদের বৃহত্তম সমাবেশ বাংলাদেশের এই বিশ্ব ইজতেমা। ভারতের দিল্লিতে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ তা মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েতে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে টঙ্গীর প্রায় পাঁচ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ইজতেমা বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য, সম্প্রীতি, সৌহার্দের এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র, যা ইসলামি সমাজ, শৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ব ও মহানুভবতার এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।

তাবলিগ আরবি শব্দ, বালাগ শব্দ থেকে আগত। যার শাব্দিক অর্থ পৌঁছানো, প্রচার করা, প্রসার করা, বয়ান করা, চেষ্টা করা, দান করা ইত্যাদি। পরিভাষায় একজনের অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা নিজ ইচ্ছা ও চেষ্টার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানোকে তাবলিগ বলে।

ইজতেমার কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে ইজতেমার মাঠটিকে ২১টি খিত্তা বা অংশে বিভক্ত করা হয়। একেকটি খিত্তা মূলত বাংলাদেশের পুরোনো জেলাগুলোর জন্য নির্দিষ্ট। কয়েকটি থাকে বিদেশিদের ভৌগোলিক বাসস্থান ভিত্তিতে বিন্যাসকৃত। পুরোনো বৃহত্তর জেলা অনুযায়ী বিভক্ত প্রতিটি খিত্তায় একজন সিনিয়র জিম্মাদার থাকেন এবং তার অধীনে থাকেন জেলা ও থানার জিম্মাদার। সমন্বয়ের জন্য রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় ইজতেমা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। তবে ইজতেমার বিশাল আয়োজনে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করা হয় না, সব কাজই নানা স্বেচ্ছাসেবক দল দ্বারা পরিচালিত হয়।

তাবলিগ জামাতের সূচনা :রসুলুল্লাহ (স.)-এর মুখ নিঃসৃত শাশ্বত বাণী : ‘তোমার কাছে যদি কোনো বাণী থাকে, তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’ এ দাওয়াতি আহ্বানকে কেন্দ্র করেই পর্যায়ক্রমে তাবলিগের বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রসার ঘটে। এ ব্যাপারে তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রা.) অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠা, ধৈর্য, পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনায় অপরিসীম ভূমিকা রাখেন। তাবলিগ জামাতের দ্বিতীয় আমির মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভি (রা.)-এর যুগে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এ আন্দোলন সবচেয়ে বেশি ও শক্তিশালী ছিল। প্রথম ইজতেমা ১৯৪১ সালে দিল্লির নিজামউদ্দীন মসজিদের ছোট এলাকা মেওয়াতের নুহ মাদ্রাসায় আয়োজন করা হয়। এতে প্রায় ২৫ হাজার তাবলিগ দিনদার মুসলমান অংশ নেন। এভাবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে মেওয়াতের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কিছু মানুষের কাছে দিনের কথা প্রচারের মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাতের যাত্রা শুরু হয়।

উপমহাদেশের মুসলমানদের ইতিহাসের এক যুগসন্ধিলগ্নে তাবলিগ জামাতের শুভ সূচনা হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও সাধক হজরত মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভি দাওয়াতে তাবলিগ জামায়াতের পুনর্জাগরণ ঘটান। তত্কালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী দিল্লির দক্ষিণ পাশে অবস্থিত এক জনবিরল নীরব অঞ্চল ‘মেওয়াত’। চারিত্রিক বিপর্যস্ত ধর্মকর্মহীন, অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন নামেমাত্র মুসলমান ‘মেও’ জনগোষ্ঠীকে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, ধর্মের পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন ও কালেমার দাওয়াতি মর্ম শিক্ষাদান এবং বিভ্রান্তির কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রা.) তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন। ১৯২৬ সালে দ্বিতীয় হজ থেকে ফিরে এসে তিনি জনসাধারণের মধ্যে কালেমা ও নামাজের দাওয়াত দিতে লাগলেন। তাবলিগ জামাত বানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বের হওয়ার দাওয়াত দিলেন, এভাবে গ্রামে গ্রামে সৎ কাজ করার জন্য জামাত তৈরি করে দিতেন। কয়েক বছর মেওয়াতে এ পদ্ধতিতে দাওয়াতি কাজ অব্যাহত থাকল।

এ সময় তিনি বুঝতে পারলেন যে গরিব মেওয়াতি কৃষকদের পক্ষে দিন শেখার সময় পাওয়া কষ্টকর। ঘরসংসার ছেড়ে মাদ্রাসায় দিন শেখাও অসম্ভব। ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে সামগ্রিক জীবন পালটে দেওয়া বা জাহেলি বিশ্বাসকে পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়। তাই ক্ষুদ্র দল বা ছোট জামাত আকারে ইলমি ও দিনি প্রতিষ্ঠানগুলোয় গিয়ে সময় কাটানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন এবং ধর্মীয় পরিবেশে তালিম দিতে আরম্ভ করলেন। শুরুতে তাবলিগি কার্যক্রম ব্যাপক সমর্থন পায়নি, কিন্তু ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

কালক্রমে তাবলিগ সমগ্র উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করে এবং উপমহাদেশের বাইরেও এর প্রভাব পড়ে। ১৯৪৩ সালের এপ্রিলে তারা পাকিস্তানের করাচিতে একটি জামাত পাঠিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সূত্র ধরে উপমহাদেশের ভারত, পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান এ তিনটি অঞ্চলে মুসলমানদের অবস্থান সাপেক্ষে তাবলিগের তিনটি কেন্দ্র স্থাপিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান অঞ্চলের তাবলিগ জামাতের বার্ষিক ইজতেমাই এখন টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা। বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তানের রাইভেন্ডে এবং ভারতের ভুপালে এ ধরনের বড় ইজতেমা হয়, তবে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি লোকের সমাগম হয়।

বাংলাদেশে তাবলিগ জামাত :পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। সে বছর পরে তারা দক্ষিণ-পশ্চিম জেলা খুলনাতে আরও একটি বিশাল ইজতেমার আয়োজন করেছিল। তার পর থেকে তারা প্রতি বছর নিয়মিতভাবে ইজতেমার আয়োজন করে চলেছে। এই সময়ে, বাংলাদেশের কেন্দ্রটি লালবাগ শাহী মসজিদভিত্তিক ছিল। জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের কাকরাইলের বর্তমান অবস্থানে চলে যেতে হয়। ১৯৫৪ সালে প্রথম ইজতেমায় প্রায় ১৫-২০ হাজার অংশগ্রহণকারী অংশ নিয়েছিল। ১৯৫৪ সালে চট্টগ্রামের হাজি ক্যাম্পে তাবলিগ জামাতের একটি বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা হয় ১৯৫৮ সালে। ইজতেমার প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়তে থাকে এবং ১৯৬০, ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে তা ঢাকায় রমনা পার্কের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। যা হোক, ১৯৬৫ এর মধ্যেও কাকরাইল ইজতেমার পক্ষে খুব ছোট হয়ে গিয়েছিল। একই বছর তাদের ঢাকার নিকটবর্তী টঙ্গীতে ভেন্যু স্থানান্তর করতে হয়েছিল। তার পর থেকে তাবলিগ জামাত নিয়মিত টঙ্গীতে ইজতেমার আয়োজন করে আসছে।

১৯৬৬ সালে টঙ্গীর পূর্বে অবস্থিত পাগার গ্রামে খোলা মাঠে ইজতেমার আয়োজন করা হয়। সে স্থানটিও অপর্যাপ্ত হওয়ায় পরবর্তী বছর টঙ্গী মহাসড়কের পশ্চিমে তুরাগ নদীর পূর্ব তীরসংলগ্ন বিস্তীর্ণ খোলা মাঠে ইজতেমার আয়োজন করা হয়। ১৯৬৭ সাল থেকে এখানেই নিয়মিত ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ সরকার বিশ্ব ইজতেমার জন্য তুরাগ নদীর তীরবর্তী এলাকায় ১৬০ একর জমির বরাদ্দ দেয়। টঙ্গী ছাড়াও বিশ্ব ইজতেমা বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হয়।

২০১০ সাল থেকে বিশ্ব ইজতেমা দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ২০০০-২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমায় ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, মিশর, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, চীন, জাপান, কেনিয়া, তুরস্কসহ প্রায় ৭০টি দেশ থেকে সর্বমোট প্রায় ২০ লাখ তাবলিগ অনুসারী বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করেন। তিন দিনব্যাপী ইজতেমার তৃতীয় দিনে আখেরি মুনাজাতে অংশগ্রহণের জন্য রাজধানী ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহ থেকে লাখ লাখ মানুষ ইজতেমার মাঠে পৌঁছান।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ সংবাদ