অনুপম চৌধুরী
“জগতে চোর নয় কে? সবাই চুরি করে। কেউ করে আইন বাঁচাইয়া, কেউ আইন ভাঙে। স্বাধীনতার মূলধন লইয়া এ ব্যবসায়ে নামিতে যাহাদের সাহস নাই, চুরিকে পাপ বলে শুধু তাহারাই। পারিলে তাহারাও চুরি করিত। চোরের চেয়েও তাহারা অধম। তাহারা ভীরু কাপুরুষ।”
[চোর-মানিক বন্দোপাধ্যায়]
হ্যাঁ, এই জগত সংসারে সবাই চোর। সবাই চুরি করে। কেউ আড়ালে-আবডালে করার চেষ্টা করে আবার কেউ গোপনে করে। কেউ মনচুরি করে, কেউ টাকা-পয়সা। নিজের অধিকার আদায়ের জন্য বিভিন্নভাবে নানা ভঙিমায় চুরি করে। এই পরিবর্তনশীল সমাজে মানুষের ধ্যান-ধারণা, জ্ঞান সবি নানাভাবে নানা সময়ে পরিবর্তনশীল। সমাজের বাস্তব অবস্থা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে তাল মিলাতে প্রায় মানুষ হিমশিম খায়। তারপরও নানা যন্ত্রণায় প্রলুব্ধ জীবন নিয়ে সাঁতরে বেড়ায় মহাসমুদ্র। পার করে জীবনের নানা সময়। ভালো-খারাপ আবার কোনমতে বেঁচে থাকার যে অদম্য লড়াই সে অদম্য লড়াইয়ে নিজেকে সমর্পণ করে বেঁচে থাকে। এতোটা কথার একটাই তাৎপর্য তা হলো মানুষ, তার স্বীয় অধিকার আদায়ে সদা তৎপর। বলছিলাম প্রবোধ কুমার বন্দোপাধ্যায় সাথে তাল মিলিয়ে। প্রবোধকুমার বন্দোপাধ্যায় হল তাঁর পিতৃদত্ত নাম। বাবা-হরিহর বন্দোপাধ্যায় ও মা নীরদা দেবী। আবার এই প্রবোদকুমারের ডাক নাম মানিক। মানিক বন্দোপাধ্যায়। যার সুনিপুণ বিস্তার বাঙলা সাহিত্যের জন্য বিস্ফোরণ। সাহিত্যভা-ারকে ঋদ্ধ করার অঙ্গীকারে যার পদচারণা, সেই মানিক তাঁর লেখনি দিয়ে আজ এবং আগামীতেও বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল দূত্যির ন্যায় জ্বলজ্বলে এক মহামানব। মানিক বন্দোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন ৬ জ্যেষ্ঠ ১৩১৫ বাংলা ১৯মে, ১৯০৮ খ্রি. সাঁওতাল পরগনার দুমকা নামক স্থানে। পৈত্রিক নিবাস ঢাকার বিক্রমপুরে। পিতামাতার ১৪ সন্তানের মধ্যে মানিক পঞ্চম। বাবার চাকরি সূত্রে মানিকের ছিল ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় পদার্পণ যার বদৌলতে কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনে শুরু হয় শিক্ষা জীবন। পরবর্তীতে পড়েন টাঙ্গাইলে তারপর ১৯২৬ খ্রি. মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেকেই প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষার উত্তীর্ণ হন। ১৯২৮ খ্রি. বাঁকুড়ার ওয়েসলিয়ান মিশন থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অংকে অনার্স নিয়ে বি.এসসি ক্লাসে ভর্তি হয় কিন্তু তত দিনে সাহিত্য চর্চার নেশার যে ভূত তা ছাড়ে না। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে বিচিত্র পত্রিকায় ‘অতসী মামী’ নামক গল্প দিয়েই সাহিত্য জগতে লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। লেখালেখির নেশা মাথা দিয়ে চেপে বসায় বিএসসি পরীক্ষায় পরপর দুবার অকৃতকার্য হন। পরে সাহিত্যকর্মে এমনভাবেই যুক্ত হয়ে পড়েন যার জন্যে পড়ালেখা ইতি ওখানেই টানতে হয়েছিল।
সাহিত্যই ছিল মানিকের আয়ের একমাত্র উৎস। পড়ালেখার ইতি টানার পর সাহিত্য জগতের প্রতি ধাপে বিচরণ করায়, তেমনটা পিছু ফিরে তাকাতে হয় নি। দু’একবার সাহিত্য সংশ্লিষ্ট দু-একটি কর্ম থেকে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেন। ১৯৩৪ সালে কয়েক মাস ১০/বি পঞ্চানন ঘোষ লেন থেকে প্রকাশিত নবারুণ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত থাকেন। ১৯৩৭-৩৮সালে ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৩৯ সালে অনুজ সুবোধকুমার বন্দোপাধ্যায়ের একান্ত সহযোগিতায় উদয়াচল প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং হাউস নামে প্রেস ও প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকেই পঞ্চম গল্পগ্রন্থ “বৌ” প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রথম সংস্করণে (১৯৪০) আটটি গল্প ছিল, দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৪৬) সংযুক্ত হয় আরো পাঁচটি গল্প। ১৯৪৩ সালে ভারত সরকারের পাবলিসিটি অ্যাসিসট্যান্ট পদে কয়েকমাস অধিষ্ঠিত ছিলেন। লেখাই ছিল মানিকের প্রধান পেশা। ১৯৪৩ সালে ফ্যাসিস্ট-বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের সদস্য হন। ১৯৪৪ সালে ফ্যা-বি-লে-ও-শি সংঘের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনের সভাপতি ম-লীর অন্যতম সদস্য। ১৯৪৫ সালে ‘প্রগতি’ লেখক সংঘের (ফ্যা-বি-লে-ও-শি-স এর পরিবর্তিত নাম) সভাপতি ম-লীর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে মানিক ও স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য সংঘের য্গ্মু-সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময়, দাঙ্গাবিরোধী ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৯ সালে সংঘের চতুর্থ বার্ষিক সম্মিলনীতে সভাপতিত্ব করেন।
১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে সুরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের তৃতীয় কন্যা কমলা দেবীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। চার সন্তান তারা হলেনÑশান্তা ভট্টাচার্য, প্রশান্ত বন্দোপাধ্যায়, শিপ্রা চক্রবর্তী ও সুকান্ত বন্দোপাধ্যায়।
মানিক বন্দোপাধ্যায়ের জীবদ্দশায় উপন্যাস-গল্প-নাটক গ্রন্থাবলি মিলিয়ে ৫৭টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম গ্রন্থ ‘জননী’ উপন্যাস, ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয়, সর্বশেষ গ্রন্থ ‘মাশুল’ উপন্যাস, ১৯৫৬ সালে মৃত্যুর এক মাস আগে প্রকাশিত হয়। মানিকের মৃত্যুর পরে তাঁর উপন্যাস-গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-রচনাবলী মিলিয়ে প্রায় ২৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তেরো খণ্ডে প্রকাশিত ‘মানিক গ্রন্থাবলী’ ১৯৬৩-৭৬ এবং ‘অপ্রকাশিত মানিক বন্দোপাধ্যায়’ (১৯৭৬)। এই গ্রন্থাবলীর বাইরেও মানিকের বহু অগ্রন্থিত রচনা রয়েছে। মানিকের রচনাসমূহ তখনকার সব ধরনের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তৎমধ্যে ‘বঙ্গশ্রী’ আনন্দবাজার পত্রিকা, মৌচাক, চতুরঙ্গ, পূর্বাশা, কালান্তর, যুগান্তর, শারদশ্রী উল্লেখযোগ্য।
মানিক ১৯৪৪ সালে কম্যুনিষ্ট পার্টিতে যোগদান করেন। এর ফলে লেখালেখির জীবনে বিশাল এক পরিবর্তন সূচিত হয়। ১৯৪৭ সালে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় কবি বিষ্ণু দে’র সঙ্গে এক সাহিত্যিক বিতর্কে অবতীর্ণ হন। কম্যুনিষ্ট পার্টিতে যোগদানের ঠিক দশবছর পরে ১৯৫৪ সালে, মানিকের ডায়েরিতে আধ্যাত্মিকতার সূচনা হয়। হয়তো মাত্র ৪৮ বছর বয়সে অকালে প্রয়াণ না করলে রচনায় আধ্যাত্মিকতার স্বাক্ষর পড়ত।
লেখায় ছিল মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রধান পেশা। যার ফলে দারিদ্র্য ছিল তাঁর চিরসঙ্গী। ক্রমাগত বিশ্লেষণাত্মক গল্প-উপন্যাস রচনা, অসুখ, অর্থাভাব, সামাজিক-রাজনৈতিক ক্লিষ্টতা মানিককে বিপর্যস্ত করে দেয় হয়ত সে সব বিস্মরণের জন্যেই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, যা থেকে অনেক চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত মুক্তি পান নি। নির্জনস্বভাব, বন্ধুহীন জীবন, একাকী মানুষ ছিলেন মানিক। তাঁর কোন গ্রন্থ প্রিয়জনকে উৎসর্গ করেন নি। একমাত্র উৎসর্গ ‘স্বাধীনতার স্বাদ’(১৯৫১) উপন্যাসের, উৎসর্গ পত্রটিও মানিকের রচনার মতোই অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক। ‘সম্প্রদায় নির্বিশেষে জনসাধারণকে এই বইখানা উৎসর্গ করলামÑ জনসাধারণই মানবতার প্রতীক’। ১৯৫৬ সালের ৩০ নভেম্বর মানিক অজ্ঞান হয়ে যান, ২ ডিসেম্বর নীত হন নীলরতন সরকার হাসপাতালে এবং ৩ ডিসেম্বর মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের জন্য ততোটা সুখকর সংবাদ ছিল না। তারপরও নিয়তির আশ্রয়ে বন্দি আমাদের ভাগ্যরেখা। সেই ভাগ্যরেখায় জীবনের প্রতিচ্ছবি।
ছোটগল্প-আকারে ছোট, ছোট ছোট সুখদুখের কথা দিয়ে সহজ সরল ভঙ্গিমায় এগিয়ে যাবে; যেখানে থাকবে না বর্ণনার বিশাল রূপ। মানুষের জীবনাচরণের ক্ষুদ্র অংশ থেকে বেরিয়ে আসে ছোটগল্প। প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে নানা ঘটনা ঘটে চলেছে ওসব ঘটনায় সামান্য রস মিশিয়ে একটু সুন্দরভাবে উপস্থাপন করলে ছোটগল্প পাওয়া যায়।
সুদূর প্রাচীনকালেও সংস্কৃত, লাতিন, ইতালি ও ফরাসী ভাষায় ‘টেল’ বা আখ্যান রচিত হয়েছে। মানুষের গল্প শোনার আগ্রহ তো চিরন্তন। কিন্তু প্রাচীন আখ্যান ও আধুনিক কালের ছোটগল্প স্বরূপধর্মের দিক থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। উপন্যাসের বিকাশ একটা নির্দিষ্ট পরিণতির স্তরে পৌঁছার পরেই ছোটগল্পের উদ্ভব হয় এবং এডগার অ্যালান পো, মোপাঁসা, চেখভ ও হেনরি প্রমুখ শিল্পীদের চর্চায় এটি আঙ্গিকগত উৎকর্ষ লাভ করে।
আয়তনের ক্ষুদ্রতাই ছোটগল্পের একমাত্র বৈশিষ্ট্য নয়। গীতিকবিতার মতো ছোটগল্পের সর্বপ্রকার বাহুল্যবর্জিত সংহত রূপে একটি নির্দিষ্ট সুনির্বাচিত সীমায় জীবনের সুখ-দুখ, আশা-আকাক্সক্ষা ও সমস্যা যন্ত্রণার একটি মাত্র দিক জীবনের খণ্ডাংশ বিদ্যুতের মতোই মুহূর্তে জীবন্ত দীপ্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, বিন্দুতে সিন্ধুর স্বাদের মতোই জীবনের একাংশের চকিত স্ফুরণেই মানবজীবনের অপরিমেয়তা আভাসিত হয়। মানিকের সমগ্র জীবনে ডজনের উপরে ছোটগল্প গ্রন্থ থাকলেও প্রাগৈতিহাসিক ততমধ্যে উল্লেখযোগ্য। প্রাগৈতিহাসিক গ্রন্থের প্রাগৈতিহাসিক গল্পটি প্রধান চরিত্র ভিখু আজো জ্বলজ্বলে এই সমাজে। মানিক জীবনের দুঃখ-কষ্ট-জ্বালা খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছে যার ফলশ্রুতিতে তাঁর লেখনির মধ্যে এসব নিন্ম মানুষের কথায় সর্বদা বর্ণিত হয়েছে।
‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প-‘প্রাগৈতিহাসিক’। এগল্পে মানুষের জৈবিক তাড়না, ক্ষুধা ও লোভ-লালসার দারুণ ক্যানভাস পাওয়া যায়। মানিকের লেখা এতোটা চমকপ্রদ যে, জীবনের সাথে মিশে জীবনের সুখ-দুঃখের একেবারে গোড়ায় চলে যান আর চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তুলেন দারুণভাবে । এই গল্পের প্রধান পুরুষ চরিত্র ভিখু। ভিখু এখন একটা চরিত্র যার জন্য মানিক বন্দোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। আর এখনো পর্যন্ত বাংলা ছোটগল্পে চরিত্র বিচারে ভিখু অনন্য ও অতুলনীয়। সে খুন, ডাকাতি ও রাহাজানি করে আনন্দ পায়। মানুষ খুন করতে সে মোটেও ভয় পায় না। নারীর ইজ্জত হরণ করে সে আনন্দে অট্টহাস্য করে। আদিম উল্লাসে নৃত্য করে বেড়ায়। ভিখু চরিত্রটিকে প্রথম থেকে দেখা যায় তার যে চাহিদা, সে চাহিদা যে কোন মূল্যে তার চাই-ই। এবং তার যে প্রথমদিককার না পাওয়ার হতাশা তাকে ডাকাত বানাতে সাহায্য করে। এবং তার যেটা দরকার সেটা সে কোন মূল্যে তার লাগে। এমনিভাবে তাকে থাকতে দেয় পেহলাদ। অনেক সেবাযতœ করে সুস্থ করে তোলে। সুস্থ হতেই ভিখুর আসল চরিত্র প্রকাশ পায়। একদিন বাড়িতে একা পেয়ে পেহলাদের স্ত্রীর দিকে কামাতুর হাত বাড়ায় সে। স্ত্রী ঘটনাটা বলে দেয় পেহলাদকে। পেহলাদ ও তার ভগ্নিপতি মিলে বেদম প্রহার করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় ভিখুকে। এবং যাওয়ার সময় ভিখু পেহলাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায়। ভিখু সবসময় যার তালায় খায় তার তালা কানা করার পাঁয়তারা খোঁজে।
মানিকের বর্ণনায় আমরা ভিখুকে পাই এভাবে- “নদীর ধারে ক্ষ্যাপার মতো ঘুরিতে ঘুরিতে তাহার মনে হয় পৃথিবীর যত খাদ্য ও যত নারী আছে একা সব দখল করিতে না পারিলে তাহার তৃপ্তি হইবে না।”
পুরো গল্পে আমরা দেখি ভিখুর আদিমতাকে মানিক এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেটা সত্যির জায়গা থেকে কোন অংশে কম না। আর ভিখুর চরিত্রটা এমনি যে, নারী সঙ্গহীন জীবন তার কাছে পানসে মনে হয়। সে যত পায়, আরো চায়। গল্পের শেষের দিকে দেখি ভিখু যখন নারী সঙ্গের জন্য পাগল প্রায় তখনি এক ভিখারিনীর দিকে তার চোখ যায়। এবং আস্তে আস্তে ভাব জমায়। অপকর্মের জন্য ফুসলায়। কিন্তু ভিখারিনী পাঁচী তাকে পাত্তা দেয় না। সে তার পছন্দের মানুষ বসির মিঞার কথা বলে এবং বসিরের সাথে রাত্রিযাপন করে। তারপরও হাল ছাড়ে না ভিখু। সবশেষে দেখা যায়Ñএকদিন গভীর রাতে ভিখু বসিরকে খুন করে এবং টাকা-পয়সা সব হাতিয়ে নেয় তারপর পাঁচীকে কাঁধে তুলে নিয়ে আদিম উল্লাসে পা বাড়ায়। এই হলো মানিকের প্রাগৈতিহাসিক গল্প। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মানুষ এমনিভাবে অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করেছে একে অপরের সঙ্গে, কাড়াকাড়ি করছে খাদ্য নিয়ে কখনো বা প্রিয় নারীকে নিয়ে। একক ব্যক্তি জীবনে তা যেমন হয়েছে যূথবদ্ধ, আদিমতম গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনেও তা সহ্য হয়েছে। অন্ন, বস্ত্র, অর্থ-বাসস্থান, প্রেম ও জৈবিকতার অত্যাবশ্যক তাগিদ মানুষকে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই সামনে চলার ইঙ্গিত দিয়েছে। মানিকের এই গল্প বর্তমানের জন্যও উপযুক্ত। বর্তমান সময়ে যা হচ্ছে তা অতীতেও হয়েছিল ভবিষ্যতেও হবে। তাই মানিক বর্তমানের সাথে সাথে চলমান।
প্রাগৈতিহাসিক গল্পগ্রন্থের দ্বিতীয় গল্প ‘চোর’-মানিক এখানে দেখিয়েছে যে- জগতে সবাই চোর, কমবেশি সবাই চুরি করে। কেউ অধিকার আদায়ে, কেউ মনের আনন্দে, আবার কেউ হিংসা ও অহংকার পরম্পরায়। এ গল্পের প্রধান চরিত্র কাদু ও মধু। মধুর প্রধান কাজ মানুষের ঘরে সিঁধ কাটা আর অবৈধভাবে টাকা রোজগার। এ গল্পে দেখা যায় কাদু হল মধুর স্ত্রী। বিয়ে করার পর থেকে ততোটা সুখ পায় নি কাদু। অভাব-অনটনের সংসারে কোনমতে দিনাতিপাত করছে। কাদু রাখাল বাবুর ঘরে ঝি এর কাজ করে সংসারে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। মধু একদিন ভাবে রাখাল বাবুর ঘরে সিঁদ কাটবে সেজন্য কাঁদুকে দিয়ে আগে থেকে ঘরের নকশা তৈরি করে। একদিন রাতে রাখাল বাবুর ঘরে সিঁদ কাটে। রাখাল বাবুর মেয়ের বিয়ের জন্য রাখা সমস্ত সঞ্চয় চুরি করতে আসে। ওদিকে রাখাল বাবুর ছেলের সাথে মধুর স্ত্রীর প্রেম হয় এবং যেদিন মধু সিঁদ কাটে সেদিন পান্নালাল (রাখাল বাবুর ছেলে) মধুর ঘরের সিঁদ কাটে। তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে চলে যায়। তাই মানিকে গল্পে দেখি ‘জগতে সবাই চোর’।
একপর্যায়ে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের বর্ণনায় আমরা দেখি “অথচ চোরেরা জীবনে বড় একা। ওদের আপন কেহ নাই। কবির মতো, ভাবুকের মতো, নিজের মনের মধ্যে ওরা লুকাইয়া বাস করে। যে স্তরের অনুভূতিই ওদের থাক, সে রুক্ষ শ্রীহীন সীমানার মধ্যে ওদের কল্পনা সীমাবদ্ধ হোক, ওদের অনুভূতি,ওদের কল্পনা ক্ষণে ক্ষণে বিচিত্র, পরিবর্তনশীল। অনেক ভদ্রলোকের চেয়ে ওরা বেশি চিন্তা করে। জীবনের এমন অনেক সত্যের সন্ধানে ওরা পায়, বহু শিক্ষিত সুমার্জিত মনের দিগন্তে যাহার আভাস নেই। কবির নেশা নারী, চোরের নেশা চুরি। আসলেও দুটো নেশাই মানসিক উর্বরতা, বিধানের পক্ষে সমান সাবধান। সংসারে এমন লক্ষ লক্ষ সাধু আছে, যাহাদের লইয়া আমি গল্প লিখিতে পারি না। জীবনে তাহাদের গল্প নাই। প্রেমিকের মতো অন্যায় অসঙ্গত চুরি করা প্রেমের বুৎপন্ন প্রেমিকের মতো চোরের জীবন গল্পময়।”
প্রাগৈতিহাসিক গল্পগ্রন্থের আরো গল্পগুলো হল-‘যাত্রা’, ‘প্রকৃতি’, ‘ফাঁসি’, ‘ভূমিকম্প’, ‘অন্ধ’, ‘চাকরি’ ও ‘মাথার রহস্য’। আসলে প্রতিটা গল্পের বিষয়বস্তু উল্লেখ করতে গেলে লেখাটির ইতি টানা হবে না। তাই গল্প গ্রন্থের সামগ্রিকতা বিচারে প্রাগৈতিহাসিক নাম নির্ণয়, গল্পগুলোর বিষয়বস্তু সবদিক দিয়েই মানিক বন্দোপাধ্যায় সফল। ছোটগল্প মানব মনের অপরিহার্য অনুভূতির এক সুললিত বহিঃপ্রকাশ। তবে সংঘাত তত্ত্বের বিচারে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় ছোটগল্প অনেক কম। বিভাগপূর্ব মুসলিম কথাসাহিত্যিকগণ ছোট গল্প রচনাতেই মনোনিবেশ করেছেন উপন্যাসের অনেক কাল পরে। এর কারণ বিচিত্রমুখী-তবে সামাজিক, চারিত্রিক ও অর্থনৈতিক কারণই প্রধানত গুরুত্বপূর্ণ। ৪৭ পরবর্তী ছোট গল্পে আমরা অনেক গল্পকারকেই পাই যারা সফল-শওকত ওসমান, আবু ইসহাক, সরদার জয়েনউদ্দীন, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান হাসান আজিজুল হক, কায়েস আহমেদ এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম ধারার অন্যান্য ছোটগল্পকারদের মধ্যে আবু রুশদ (শাড়ি, বাড়ি, গাড়ি), জাহাঙ্গীর খালেদ (একটুকরো হাসি), নূর উল-আলম (প্রসাধন), শহীদ সাবের (এক টুকরো মেঘ), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (দুইতীর) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জৈবিক ক্ষুধার ইতিহাস। জৈবিক ক্ষুধার জন্য মানুষ যে পশুতে পরিণত হতে পারে সে কথাই বর্ণিত হয়েছে ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গ্রন্থের নানা গল্পে। জৈব প্রেরণা মানুষের আদিম প্রবৃত্তি। ভিখু ও পাঁচী জন্মগতভাবে কামনা-বাসনা ও জৈব তাড়না লাভ করেছে এবং এ প্রবৃত্তিকেই তারা আবার তাদের সন্তান-সন্ততির মাঝে সঞ্চারিত করে যাবে। এ প্রবৃত্তি নিতান্তই প্রাগৈতিহাসিক। বীরভোগ্য বসুন্ধরায় এভাবেই গড়ে উঠেছে সৃষ্টির শাশ্বত লীলা। এ তাৎপর্যের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়েছে প্রাগৈতিহাসিক গ্রন্থের গল্পগুলো। তাই প্রাগৈতিহাসিক নামকরণও সার্থক এবং সুন্দর হয়েছে। মানিক বন্দোপাধ্যায় তাঁর গল্প-উপন্যাস মানুষকে দেহজীবী মানুষরূপেই দেখেছেন, তাঁর বাসনা-কামনা সমাজজীবন প্রভৃতিকে তিনি সূক্ষ্মভাবে ভাবরসে নিমজ্জিত করতে চাননি। তাঁর প্রাগৈতিহাসিক গ্রন্থের গল্পগুলো এমন দৃষ্টান্ত উজ্জ্বল। সমাজ জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি এই ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পগ্রন্থ।
























