Sat, January 28, 2023
রেজি নং- আবেদিত

‘লায়লাতুন নিসফি মিন শাবান’ (শবেবরাত)-এর তাৎপর্য

মুফতি মুতিউর রাহমান: পবিত্র শাবান মাসের একটি ফযীলত ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত রাত শবেবরাত। ১৫ শাবান রাতই সে শবে বরাত। আরবি দিন-তারিখের হিসেবে রাত আগে আসে বলে ১৪ শাবান দিবাগত রাতই ১৫ শাবানের রাত। রাসূল (সা.) হাদীসে এ মহিমান্বিত রাতকে ‘লায়লাতুন নিসফি মিন শাবান’ ১৫ শাবানের রাত বলেছেন। হাদীসে এ রাতের অন্য কোনও নাম পাওয়া যায় না। তবে আমাদের সমাজে এ রাতটি শবে বরাত নামেই অধিক প্রসিদ্ধ। ফার্সি ‘শব’ আর আরবি ‘বরাআত’ শব্দ দু’টির সমন্বয়ে গঠিত শবে বরাত। ‘শব’ অর্থ রাত, রজনী। আর বরাআত অর্থ মুক্তি, নিষ্কৃতি, অব্যাহতি, পবিত্রতা ইত্যাদি। সুতরাং শবে বরাতের শাব্দিক অর্থ দাঁড়ায় মুক্তি, নিষ্কৃতি, অব্যাহতির রজনী। এ রাতে যেহেতু আল্ল­াহ তাআলা পাপী লোকদের ক্ষমা করেন, নিষ্কৃতি দেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন সেহেতু এ রাতকে লায়লাতুল বরাআত বা শবে বরাত বলা অযৌক্তিক নয়। বহু হাদীসে শবে বরাআতের ফযীলত ও মর্যাদার বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়।

عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ، قَالَ: «مَا مِنْ لَيْلَةٍ بَعْدَ لَيْلَةِ الْقَدْرِ أَفْضَلُ مِنْهَا, يَعْنِيْ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ».

‘হযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লায়লাতুল কদরের পরে পনের শাবানের রাত অপেক্ষা অধিক উত্তম ও ফযীলতপূর্ণ অন্য কোনও রাত নেই।’[১]

এ রাতে কি হয়? এ প্রসঙ্গে এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

وَعَنْ عَائِشَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ^، قَالَ: « هَلْ تَدْرِينَ مَا هَذِهِ اللَّيْلَةُ؟» يَعْنِي لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ قَالَتْ: مَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللهِ! فَقَالَ: «فِيْهَا أَنْ يُكْتَبَ كلُّ مَوْلُوْدٍ مِّنْ بَنِيْ آدَمَ فِيْ هَذِهِ السَّنَةِ وَفِيْهَا أَنْ يُّكْتَبَ كُلُّ هَالِكٍ مِّنْ بَنِيْ آدَمَ فِيْ هَذِهِ السَّنَةِ وَفِيْهَا تُرْفَعُ أَعْمَالُـهُمْ وَفِيْهَا تَنْزِلُ أَرْزَاقُهُمْ» .

হযরত আয়িশা (রাযি.) রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, হে আয়শা! এ রাতে কি হয় জানো? হযরত আয়শা প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ রাতে কি হয়? তিনি বললেন, ‘এ রাতে আগামী বছর যত শিশু জন্ম নেবে এবং যত লোক মারা যাবে তাদের নাম লেখা হয় এবং মানুষের বিগত বছরের সব আমল আল­াহর দরবারে পেশ করা হয়। এ রাতে মানুষের রিয্‌ক অবতীর্ণ হয়।’’[২]

عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ، قَالَ: إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ , نُسِخَ لِـمَلَكِ الْـمَوْتِ كُلُّ مَنْ يَّمُوْتُ فِيْ تِلْكَ السَّنَةِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَىٰ شَعْبَانَ، قَالَ عَطَاءُ بْنُ يَسَارٍ: إِنَّ الرَّجُلَ لَيَظْلِمُ , وَيَفْجُرُ , وَيَنْكِحُ النِّسْوَانَ , وَيُعَرِّسُ الْأَعْرَاسَ , وَمَا اسْمُهُ فِي الْأَحْيَاءِ.

‘হযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রা.) বলেন, পনের শাবান রাতে মৃত্যুর দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা আযরাইল (আ.)-কে আল্ল­াহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি তালিকা দেওয়া হয় এবং এ তালিকায় যাদের নাম আছে তাদের প্রাণ হরণের আদেশ দেওয়া হয়। এদের কেউ বাগানে বৃক্ষরোপণ করতে থাকে, কেউ বিয়ে করে, কেউ প্রাসাদ নির্মাণ করে, অথচ যারা মৃত্যুবরণ করবে তাদের তালিকায় নাম লেখা হয়ে গেছে।’[৩]

এ হাদীসগুলো বিশদভাবে পর্যালোচনা করলে সহজেই বুঝে আসে, লায়লাতুন নিসফ মিন শাবান শবে বরাত ভাগ্য রজনী বটে। এ রাতে আগামী পনের শাবান পর্যন্ত এক বছরের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। জীবন-মরণ-সুখ-দুঃখ বিপদ-আপদ ইত্যাদির সব কিছু চূড়ান্ত হয়। শবে বরাতে আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হয়। পাপীদের ক্ষমা করা হয়। জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হয়। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং ফজর পর্যন্ত মানুষকে তাঁর কাছে ক্ষমা, রোগমুক্তি, জাহান্নাম থেকে নাজাত, রিয্‌ক ইত্যাদি বৈধ সব কিছু প্রার্থনা করার আহ্বান করতে থাকেন।

عَنْ أَبِيْ بَكْرٍ، قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ^: «إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ يَنْزِلُ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَىٰ إِلَىٰ سَمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَغْفِرُ لِعِبَادِهِ إِلَّا مَا كَانَ مِنْ مُّشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ لِأَخِيْهِ».

‘হযরত আবু বকর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তাআলা শবে বরাতে পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং কাফির-মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকেই ক্ষমা করেন।’’[৪]

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: فَقَدْتُ رَسُوْلَ اللهِ ^ لَيْلَةً فَخَرَجْتُ، فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيْعِ، فَقَالَ: «أَكُنْتِ تَخَافِيْنَ أَنْ يَّحِيْفَ اللهُ عَلَيْكِ وَرَسُوْلُهُ»، قُلْتُ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! إِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ، فَقَالَ: «إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَغْفِرُ لِأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ».

হযরত আয়িশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক রাতে প্রিয় নবীজীকে হারিয়ে ফেললাম। অতঃপর আমি তাঁকে খুঁজতে বের হলাম। অবশেষে তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে খুঁজে পেলাম। আমাকে দেখে তিনি বললেন, ‘হে আয়িশা! তুমি কি আশঙ্কা করছ যে, আল্ল­াহ ও তাঁর রাসূল (সা.) তোমার প্রতি যুলুম করবেন’? হযরত আয়িশা (রাযি.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম আপনি হয়তো আপনার অন্য কোনও স্ত্রীর কাছে গিয়েছেন। অতঃপর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘পনের শাবান রাতে আল­াহ তাআলা পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন এবং বনু-কালব গোত্রের মেষের পশম অপেক্ষা অধিক লোকদের ক্ষমা করেন।’’[৫]

عَنْ عُثْمَانَ بْنِ أَبِي الْعَاصِ، عَنِ النَّبِيِّ ^، قَالَ: «إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ نَادَىٰ مُنَادٍ: هَلْ مِنْ مُّسْتَغْفِرٍ فَأَغْفِرَ لَهُ، هَلْ مِنْ سَائِلٍ فَأُعْطِيَهُ فَلَا يَسْأَلُ أَحَدٌ شَيْئًا إِلَّا أُعْطِيَ إِلَّا زَانِيَةٌ بِفَرْجِهَا أَوْ مُشْرِكٌ».

‘হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রাযি.) রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘পনের শাবান রাতে আল্ল­াহর পক্ষ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকেন, কোনও ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছ? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনও প্রার্থনাকারী আছ? আমি তাকে দান করব। তখন যে আল্লাহর কাছে যা কিছু চায় আল্লাহ তাকে তা দান করবেন ব্যভিচারিণী ও মুশরিক ব্যতীত।’’[৬]

কিন্তু এ পবিত্র মহান ও সাধারণ ক্ষমার রজনীতেও কিছু হতভাগ্য লোকদের ক্ষমা করা হয় না। এ পবিত্র ও সাধারণ ক্ষমার রাতেও যাদের ক্ষমা করা হয় না তাদের চেয়ে হতভাগ্য, বঞ্চিত আর কে? তা ছাড়া তাদেরও নিরাশ হওয়া উচিত নয়। বরং তাদের উচিত হচ্ছে, এসব পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে তওবা করা। ভবিষ্যতে এরকম কাজ আর না করার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করা। এ রাতে অধিকহারে ইস্তিগফার ক্ষমাপ্রার্থনা করা। পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তানের জন্য উচিত পিতা-মাতার কাছে ক্ষমা চাওয়া। যে কোনও উপায়ে তাদের খুশি করা এবং নিজের অপরাধ ক্ষমা করানো।

শবে বরাতে করণীয় সম্পর্কে এক হাদীসে এসেছে,

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِيْ طَالِبٍ، قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ^: «إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقُوْمُوْا لَيْلَهَا وَصُوْمُوْا نَهَارَهَا».

‘হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘পনের শাবানের রাত জেগে ইবাদত কর এবং পরদিন রোযা রাখ।’’[৭]

এ হাদীস থেকে শবে বরাতের দু’টি করণীয় বুঝে আসে।

১. রাত জেগে বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগি যেমন- নামায, কুরআন তিলাওয়াত, যিক্‌র, তওবা, ইস্তিগফার ইত্যাদি করা এবং

২. পরদিন রোযা রাখা।

যেহেতু এ রাতে সাধারণ ক্ষমা করা হয়, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হয় সেহেতু কবরবাসী আত্মীয়-স্বজন মুমিন নর-নারীদের কবর আযাব মাফের জন্য দুআ করা উচিত। সম্ভব হলে কবরস্থানে গিয়ে কবর যিয়ারত করা অথবা যে কোনও স্থান থেকে দুআ করা। আমাদের সমাজে এবং বিশেষভাবে শবে বরাতে হালুয়া-রুটির একটি প্রচলন রয়েছে। অনেকে এ ব্যাপারে খুবই গুরুত্বারোপ করেন। হালুয়া-রুটির আয়োজন না করা হলে শবে বরাতই পালন হল না বলে অনেকে মনে করেন। অনেকে তো এ রাতে ইবাদত-বন্দেগির কোনও গুরুত্ব দেন না। কিন্তু হালুয়া-রুটির আয়োজন করেন। এটা এক ধরনের কুসংস্কারও বটে। হালুয়া-রুটি বছরের যে কোনও দিনে যে কোনও সময় পাকানো ও খাওয়া যায়। কিন্তু শবে বরাতের সঙ্গে এর বৈশিষ্ট্য কি? রাসূল (সা.) সাহাবায়ে কেরাম তাবিঈন, তাব-ই-তাবেঈন এবং যুগে যুগে ওলামায়ে কেরাম এটা করেননি। উপরন্তু যেহেতু এ রাতে ইবাদত-বন্দেগির রাত তাই এ রাতে সব ঝামেলা মুক্ত হয়ে ইবাদতে মগ্ন হওয়াই বাঞ্ছনীয়। হালুয়া-রুটির ফিকর এ রাতের সেই কাঙিক্ষত ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়।

 


[১] আল-লালাকায়ী, শরহু উসিলি ই’তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ, দারু তাইয়িবা, রিয়াদ, সুউদি আরব (প্রথম সংস্করণ: ১৪২৩ হি. = ২০০৩ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ৫০০, হাদীস: ৭৬৯
[২] (ক) আল-বায়হাকী, আদ-দা’ওয়াতুল কবীর, গিরাস লিন-নাশর ওয়াত-তাওযী’, কুয়েত (প্রথম সংস্করণ: ১৪০৯ হি. = ১৯৮৯ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ১৪৬, হাদীস: ৫৩০; (খ) আত-তাবরীযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, আল-মাকতাবুল ইসলামী, বয়রুত, লেবনান, খ. ১, পৃ. ৪০৮, হাদীস: ১৩০৫
[৩] আশ-শাজারী, আল-আমালি আল-খমীসিয়া, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২২ হি. = ২০০১ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ১৪২, হাদীস: ১৮৮৬
[৪]আল-বায্যার, আল-মুসনদ = আল-বাহরুয যাখ্খার, মকতবাতুল উলুম ওয়াল হাকাম, মদীনা মুনাওয়ারা, সুউদি আরব, খ. ১, পৃ. ১৫৭, হাদীস: ৮০
[৫] আত-তিরমিযী, আল-জামি‘উল কবীর = আস-সুনান, মুস্তফা আলবাবী অ্যান্ড সন্স পাবলিশিং অ্যান্ড প্রিন্টিং গ্রুপ, হলব, মিসর, খ. ৩, পৃ. ১০৭, হাদীস: ৭৩৯
[৬] আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, মাকতাবাতুর রাশাদ, রিয়াদ, সুউদী আরব, খ. ৫, পৃ. ৩৬২, হাদীস: ৩৫৫৫
[৭] ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, দারু ইয়াহইয়ায়িল কুতুব আল-আরাবিয়া, বয়রুত, লেবনান, খ. ১, পৃ. ৪৪৪, হাদীস: ১৩৮৮

————————–

সংগ্রহে : মাসিক আত-তাওহীদ।

 

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

এই সম্পর্কীত আরো সংবাদ পড়ুন

টানা দ্বিতীয়বারে ওয়ানডে বর্ষসেরা ক্রিকেটার বাবর

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) ২০২২ সালের বর্ষসেরা ওয়ানডে ক্রিকেটার নির্বাচিত হয়েছেন পাকিস্তানের অধিনায়ক বাবর আজম।

বিস্তারিত »